মাধবপুরে অপরাধ ছেড়ে আলোর পথে আবদুল মজিদ

  • প্রকাশের সময় : ১৮/০৫/২০২৪ ০৪:৫২:০১ AM

মাদক ও চোরাকারবারি ছেড়ে সবজির পাইকারি ব্যবসা করছেন আবদুল মজিদ। হবিগঞ্জের মাধবপুরের চৌমুহনী বাজার থেকে সম্প্রতি তোলা

Share
42

হবিগঞ্জের মাধবপুরের ভারত সীমান্তঘেঁষা রাজনগর গ্রামের আবদুল মজিদ। এক সময় মাদক ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তখন এলাকাবাসীর কাছে আবদুল মজিদ ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে একাধিকবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন। তবে এখন তিনি নিজেকে শুধরে নিয়েছেন। চাষাবাদের পাশাপাশি স্থানীয় চৌমুহনী বাজারে সবজির পাইকারি ব্যবসা করছেন। প্রতিমাসে এখন তার আয় ৫০ হাজার টাকারও বেশি।

আবদুল মজিদ বলেন, ‘এক সময় আমি খারাপ পথে ছিলাম। তখন মানুষ আমাকে ঘৃণা করত। আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না। ৭-৮ বছর হলো এগুলো ছেড়ে দিয়েছি। এখন নিজের খেতে সবজি চাষ করি, আবার সবজির পাইকারি ব্যবসাও করি। এখন যেকোনো জায়গায় আমি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। পরিবার নিয়ে অনেক ভালো আছি।’

শুধু আবদুল মজিদ নন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় এ গ্রামের অনেকেই এমন বিপথে ছিলেন। তবে এখন বেশির ভাগই ওই পথ ছেড়েছেন। কেউ মন দিয়েছেন কৃষি কাজে, কেউবা ব্যবসায়। এক সময়ের দাপুটে অনেক মাদক ও চোরাকারবারি পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। ফলে তাদের পরিবারে যেমন এসেছে সচ্ছলতা তেমনি কলঙ্ক ঘুচেছে সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোর।

রাজনগর গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব ফুল মিয়া বলেন, ‘আগে আমাদের গ্রামের অনেকেই অপরাধের পথে ছিলেন। কাঁটাতার হওয়ার আগে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে ট্রাকের পর ট্রাক গ্রামে ঢুকত। ২০০৩ সালে যখন কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়, তখন থেকেই এগুলো কমে আসতে থাকে। ৭-৮ বছর ধরে এগুলো একেবারেই কমে গেছে। এখনতো নেই বললেই চলে। কিছু কিছু ছেলেরা হয়তো এখনো টুকটাক করে। তবে বেশির ভাগই ছেড়ে দিয়েছেন।’

একই এলাকার আবদুল আজিজ বলেন, ‘সীমান্তের মানুষরা এখন অপরাধের পথ ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। কেউ সবজি চাষ করছেন, কেউবা করছেন ব্যবসা। অনেকে আবার বিদেশ চলে গেছেন। আমাদের চৌমুহনী এখন হবিগঞ্জের মধ্যে সবজির জন্য বিখ্যাত।’

মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের লোকজন। তাদের উদ্যোগে গঠন করা হয়েছে মাদক ও চোরাচালান নির্মূল কমিটি। কমিটির সদস্য রাজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলুল করিম এরশাদ বলেন, ‘আগেতো আমাদের এলাকার অবস্থা ভয়াবহ ছিল। এখন অনেক উন্নতি হয়েছে। নিজের সম্মানহানীর ভয়ে অনেকেই অপরাধের পথ ছেড়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি এবং আমরা সুশীল সমাজের মানুষ মিলে এসব অপরাধ দমনে কাজ করছি।’

তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক করেছি। এখন চোরাচালান নেই। কিছু ছেলে মাদকের সঙ্গে জড়িত। তবে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে আমরা চেষ্টা করছি।’

চৌমুহনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে আমি এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। দীর্ঘ এই সময়ে সবচেয়ে বেশি শ্রম দিতে হয়েছে চোরাচালান ও মাদক কারবারি বন্ধে। এখন আমি অনেকটাই সফল। এক সময়ের অপরাধীরা এখন নিজেদের শুধরে নিয়ে কৃষি কাজে মন দিয়েছেন।’

২০২০ সালের জুলাইয়ে ৭৫ জন মাদক ও চোরাকারবারি বিজিবির কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। নতুন করে আবারও প্রবেশনের মাধ্যমে আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নিলে অপরাধ প্রবণতা আরও কমে আসবে।

হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার আক্তার হোসেন বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের নীতি জিরো টলারেন্স। যারাই মাদক কারবারির সঙ্গে জড়িত থাকবেন, তাদের আইনের আওতায় আনব। এই ইস্যুতে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলমান আছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এখন গড ফাদারদের ধরার চেষ্টা করছি। এ ব্যাপারে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করব।’

তথ্য বলছে, বর্তমানে মাধবপুর উপজেলার ধর্মঘর ও চুনারুঘাটের ছিমটিবিলসহ কয়েকটি এলাকায় মাদক ও চোরাকারবারিরা এখনো সক্রিয় আছেন। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের।

হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কখনো অপরাধ নির্মূল করার সম্ভব না। অনেকেই আছেন- ওই পথে গিয়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরছেন। এখন তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। তাদের সুযোগ দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাদের প্রবেশনের আওতায় আনার সুয়োগ আছে। এ ক্ষেত্রে তার শাস্তি  হতে পারে গাছ লাগানো, ভালো কাজ করা, কোরআন পড়া, মা-বাবার সেবা করা ইত্যাদি। অতীতেও আমরা এগুলো দেখেছি।’


সিলেট প্রেস / ১৮ মে ২০২৪ / এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৪-০৫-১৮ ০৪:৫২:০১