মেসির দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দাপুটে শুরু

  • প্রকাশের সময় : ১৭/০৬/২০২৬ ১১:৩৯:৪০ AM

Share
6

কানসাসের রাতটা যেন লিওনেল মেসির জন্যই সাজানো ছিল। বিশ্বকাপের মঞ্চে ষষ্ঠবার। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০০তম ম্যাচ। আর সেই ম্যাচেই হ্যাটট্রিক। শুধু হ্যাটট্রিক নয়, সেই তিন গোলেই মিরোস্লাভ ক্লোসের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসালেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। আর আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।


মেসির ক্যারিয়ারে বড় রাতের অভাব নেই। কিন্তু আলজেরিয়ার বিপক্ষে এই রাত অন্যরকম। ৩৮ বছর বয়সেও তিনি যেন সময়কে থামিয়ে রেখেছেন। ফুটবল তাঁকে যা দিতে পারত, প্রায় সবই দিয়েছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য রেকর্ড। তবু বড় মঞ্চে তাঁর ক্ষুধা কমেনি। কানসাসে সেই পুরোনো মেসিকেই দেখা গেল, যিনি বল পেলেই ম্যাচের ভাষা বদলে দিতে পারেন।


ম্যাচের শুরুতেই আর্জেন্টিনা গোল পেয়ে যাচ্ছিল। ৬ মিনিটে মেসি বল জালে পাঠান, কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। দুই মিনিট পর আলজেরিয়ার ফারেস চাইবিও দারুণ ফিনিশিংয়ে গোল করেন। ভিএআরের সিদ্ধান্তে সেটিও অফসাইড। প্রথম ১০ মিনিটেই দুই দলের দুটি গোল বাতিল হওয়ায় ম্যাচে তৈরি হয় আলাদা উত্তেজনা।


তবে সেই উত্তেজনার কেন্দ্রে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেননি মেসি। ১৭ মিনিটে রদ্রিগো দি পলের পাস পেয়ে জায়গা তৈরি করেন তিনি। এরপর বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে বল পাঠান জালে। আলজেরিয়া গোলরক্ষক লুকা জিদান ঝাঁপিয়েছিলেন, কিন্তু শটের দিক, গতি ও নিখুঁততা সামলাতে পারেননি। ২০০তম ম্যাচে মেসির প্রথম উদ্‌যাপন তখনই হয়ে যায়।


গোলের পর আর্জেন্টিনা আর তাড়াহুড়ো করেনি। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মতোই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা। এনজো ফের্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও দি পলের মাঝমাঠ বলের দখল ধরে রাখে। আলজেরিয়া কখনো কখনো পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করলেও এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে বড় পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি। বিরতিতে আর্জেন্টিনা এগিয়ে ছিল ১-০ গোলে।


দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গল্প আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। ৬০ মিনিটে মেসির দ্বিতীয় গোল। ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট ঠিকমতো ধরে রাখতে পারেননি লুকা জিদান। বল বক্সের ভেতরে সামনে পড়ে গেলে মেসি সবার আগে প্রতিক্রিয়া দেখান। ডান পায়ের ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন ২-০ করেন তিনি। বয়স তাঁর ৩৯ ছুঁইছুঁই, কিন্তু বক্সে প্রতিক্রিয়ার গতিতে তিনি এখনো অনেকের চেয়ে এগিয়ে।


এরপর ৭৬ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যা রাতটাকে ইতিহাসে পরিণত করে। মাঝমাঠ থেকে বল টেনে নিয়ে নিকোলাস গনসালেসের সঙ্গে পাস বিনিময় করেন মেসি। ফিরতি বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের শটে জালের কোণ খুঁজে নেন। এটাই তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬।


এই ১৬ গোল তাঁকে নিয়ে যায় মিরোস্লাভ ক্লোসের পাশে। জার্মানির সাবেক স্ট্রাইকার এত দিন এককভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। মেসি এখন সেই রেকর্ডে ভাগ বসালেন। আর একটি গোল করলেই তিনি এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন।


মেসির এই রাত আরও বিশেষ, কারণ তিনি এখন পুরুষ বিশ্বকাপে ছয়টি আসরে মাঠে নামা বিরল ফুটবলারদের তালিকায় একক উচ্চতায়। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করেছিলেন। ২০১০-এ গোল পাননি, কিন্তু এরপর ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল করে চলেছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা ফুটবলারদের তালিকায়ও তাঁর অবস্থান আরও উজ্জ্বল হলো।


৮০ মিনিটে মেসিকে তুলে নেন লিওনেল স্কালোনি। পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানায়। নিকো পাজ তাঁর জায়গায় নামেন, কিন্তু ম্যাচের গল্প তখন শেষ। বাকি সময় আর্জেন্টিনা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। রিয়াদ মাহরেজ নেমে আলজেরিয়ার আক্রমণে কিছুটা প্রাণ আনার চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভাঙতে পারেনি।


আর্জেন্টিনার জন্য জয়টা শুধু ভালো শুরু নয়, শক্ত বার্তাও। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আবারও দেখাল, তারা শুধু মেসির আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; দল হিসেবে পরিণত, মাঝমাঠে শক্ত, রক্ষণে সংগঠিত। তবে এমন রাতে সব আলো শেষ পর্যন্ত এক মানুষের ওপরই গিয়ে পড়ে।


মেসি আবার মেসিই রইলেন। সময়ের বিপক্ষে, বয়সের বিপক্ষে, যুক্তির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি আরেকবার ইতিহাস লিখলেন। কানসাসের রাত তাই শুধু আর্জেন্টিনার জয় নয়। এটি মেসির আরেকটি অমর অধ্যায়।


সিলেট প্রেস / aa


কমেন্ট বক্স
স্পোর্টস ডেস্ক :

স্পোর্টস ডেস্ক :

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-১৭ ১১:৩৯:৪০