সিলেটে প্রায় দুই বছর ধরে আগ্নেয়াস্ত্র মজুদের অভিযোগ উঠেছে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন নেতাকর্মী ও ক্যাডারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপের আধিপত্য, প্রভাব ও শক্তি বাড়াতে গোপনে অস্ত্র সংগ্রহ ও মজুদ করা হচ্ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা ‘বুঙ্গার চিনি’ ব্যবসা থেকে অর্জিত বিপুল অর্থের একটি অংশ এসব অস্ত্র কেনায় ব্যয় করা হয়েছে।
সিলেট মহানগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জায়েদ হোসেনের নাম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা একাধিক হত্যাচেষ্টা ও অস্ত্র মামলা উঠে এসেছে।
২০২৪-২০২৫ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নগরীর মদিনা মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলা ও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত ছবি ও তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন থানায় দায়ের করা হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক মামলায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জায়েদ হোসেন এসব মামলার এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের তালিকায় রয়েছেন।
এতদিন অস্ত্র কেনাবেচা ও মজুদের বিষয়টি গুঞ্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সিলেটবাসী এর প্রকাশ্য চিত্র দেখতে পান। গত ১৮ জুলাই নগরীর আখালিয়া এলাকায় এবং ৪ আগস্ট কোর্ট পয়েন্টে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অস্ত্র হাতে অবস্থান ও হামলার অভিযোগ ওঠে। সে সময় প্রদর্শিত অস্ত্রের মধ্যে অত্যাধুনিক এম-১৬ রাইফেলও ছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি পিযুষ কান্তি দে’র ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা জায়েদ হোসেনের হাতেও একটি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে, যা অনেকেই এম-১৬ রাইফেল বলে দাবি করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত এসব অস্ত্র রাজপথে আধিপত্য বিস্তার, প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে ব্যবহার করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর অস্ত্রধারী জায়েদ আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারত থেকে অবৈধভাবে চিনি এনে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ে। সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত নিরাপদে চিনি পৌঁছে দিতে গড়ে ওঠে বিভিন্ন গ্রুপ ও উপগ্রুপ। ‘বুঙ্গার চিনি’ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় অস্ত্র সংগ্রহের প্রবণতা বাড়তে থাকে।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, যারা সীমান্ত পাড়ি দিতে পারেননি তাদের কেউ কেউ সিলেটে আত্মগোপনে রয়েছেন। এমনকি মামলার আসামি হয়েও যুবলীগ নেতা জায়েদ হোসেন সিলেটে অবস্থান করছেন এবং একটি ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে যুবলীগের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকশ’ নেতা ও পেশাজীবী বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স সংগ্রহ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আন্দোলনের সময় লাইসেন্সকৃত অস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে।
গত ১৮ জুলাই আখালিয়া এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের যৌথভাবে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সে সময় প্রকাশ্যে গুলি ছোড়া হয়। পরে ৪ আগস্ট কোর্ট পয়েন্টে ছাত্র-জনতার সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে অস্ত্রের মহড়া ও হামলার ঘটনাও ঘটে।
এদিকে অস্ত্র উদ্ধার ও অভিযুক্তদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে অস্ত্রধারীদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। প্রদর্শিত অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে, কারা এগুলোর হেফাজতে ছিল এবং কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেফতারের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক



















