কুড়িগ্রামের এক চর নিবাসী আয়েশা বেগম (প্রকৃত নাম নয়)। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না পাওয়ায় অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ করতে হয় তাকে। বিষয়টি জানার পর তাকে স্বামীর নির্যাতনের শিকারও হতে হয়। এ সময় স্বামী তাকে বলেন, একটা বড়িও জোগাড় করতে পারিস না! এমনকি আয়েশাকে গর্ভপাতে বাধ্য করা হয়। আর এটা করতে গিয়ে স্থানীয় দাইয়ের পরামর্শে গ্রাম্য পদ্ধতিতে গাছগাছড়া ব্যবহার করে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কুড়িগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
এ তথ্য প্রমাণ করে, বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রজননস্বাস্থ্য কর্মসূচি নতুন করে বড় সংকটের মুখে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নারীর স্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যু, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক সমস্যায়।
এ প্রসঙ্গে মেরি স্টোপসের লিড অ্যাডভোকেসি মনজুন নাহার বলেন, সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের যে তথ্য আমরা পেয়েছি তাতে দেখা যায়, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ না থাকায় দেশের বিপুলসংখ্যক নারী (প্রায় ২০ শতাংশ) অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার এবং গর্ভপাতে বাধ্য হচ্ছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ২৯ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর জন্য দায়ী, যা দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এমন পরিস্থিতিতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত পিল, কনডম ও অন্যান্য জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না পাওয়ায় অনেক দম্পতি কার্যকর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি থেকে ছিটকে পড়ছেন। প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক নারী একপাতা পিল ভাগ করে খাচ্ছেন, যা মূলত কোনো কাজেই আসছে না। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ছে, যা মাতৃস্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, অনেক এলাকায় স্বামীর চাহিদা অনুযায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে না পারায় নারীরা পারিবারিক সহিংসতারও শিকার হচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সহজলভ্য না থাকলে এর সামাজিক প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পারিবারিক সম্পর্ক, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে মাতৃমৃত্যু হ্রাসের অগ্রগতিও শ্লথ হয়ে পড়ছে। বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, অনেক এলাকায় আবারও বাড়িতে প্রসবের প্রবণতা বেড়েছে, যা মা ও নবজাতক উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), বিশেষ করে মাতৃমৃত্যু কমানো, সর্বজনীন প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক করা, মাঠপর্যায়ে পরিবারকল্যাণ সহকারীদের কার্যক্রম জোরদার করা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এসব বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, ২০২৪ সালে অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভপাত বেড়েছে। এছাড়া দেশের জন্মহারও (টিএফআর) বাড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে কন্ট্রাসেপটিভ কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আশা করছি, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই সংকটের সমাধান হবে।
জনসংখ্যাকে শুধু সংখ্যা হিসেবে নয়, মানবসম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। আর সেই মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রথম শর্ত হলো নারীর প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা এবং প্রত্যেক দম্পতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করা- এমন তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।



















