চলতি বছরের সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে সিলেটে। শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল ৩টায় এ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ। তবে তাপমাত্রাই নয়, বাতাসের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে ভ্যাপসা গরমে জনজীবন হয়ে উঠেছে আরও অসহনীয়। এর মধ্যে গরমের মাঝে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট।
সিলেট নগরের পাশাপাশি সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক মিনিট থেকে কোথাও টানা দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শনিবার সকাল থেকেই সিলেটজুড়ে ছিল তীব্র রোদ। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা ও গরমের তীব্রতা বাড়তে থাকে। ভ্যাপসা গরম ও অসহনীয় আবহাওয়ার কারণে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অধিকাংশ মানুষ ঘর থেকে বের হননি। ফলে নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ও যানবাহনের চলাচল ছিল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। একইভাবে বিপণিবিতান ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খোলা আকাশের নিচে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ। মাঠে কাজ করা কৃষক, রিকশাচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক ও পথের হকারদের জীবিকার তাগিদে তীব্র রোদেই কাজ করতে হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে অনেকেই মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধ রেখে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। অসহনীয় গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে নগরীর বিভিন্ন সড়কের মোড়ে আখের রস, লেবুর শরবত ও বিভিন্ন ফলের জুসের দোকানে ভিড় করেন মানুষ। কম দামে সহজলভ্য হওয়ায় লেবুর শরবতের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। অনেককে আবার গরম থেকে স্বস্তি পেতে পুকুর, নদী ও সুইমিংপুলে নেমে গোসল ও সাঁতার কাটতেও দেখা গেছে।
তীব্র গরমের মধ্যেই সিলেট অঞ্চলে বেড়েছে লোডশেডিং। নগরীর পাশাপাশি সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাতজুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে অনলাইন মিটিং ও বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে ফ্রিল্যান্সারসহ অনেকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে ছোট শিল্পকারখানা, ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, সেলুন, রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফটোকপি ও প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানেও উৎপাদন ও সেবা ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একদিকে তীব্র গরমে ঘরবাড়ি যেন আগুন হয়ে আছে, অন্যদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। পরিবারে ছোট শিশু, অসুস্থ রোগী ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে। প্রচণ্ড গরমে শরীর ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত বৃষ্টি হোক এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক।
নগরের পাঠানঠুলার বাসিন্দা রাসেল খান বলেন, একদিকে তীব্র গরম অন্যদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে থাকা যায় না। ছোট বাচ্চা আর বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
উপশহরের বাসিন্দা চম্পা দাস বলেন, দিনের বেলা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকলে গরমে ঘরে থাকা যায় না। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বাচ্চাদের পড়াশোনা- সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।
ঘাসিটুলার কলেজশিক্ষার্থী জুনেদ আহমদ বলেন, রোববারের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়তে পারছি না। গরমে বসেও থাকা যায় না।
রিকশাচালক সোহেল মিয়া বলেন, সকালে রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলাম। কিন্তু গরমের কারণে মানুষ কম বের হয়েছেন। তাই আজ আয়-রোজগারও অনেক কম।
রিকশাচালক সাজু আলী বলেন, এই গরমে রিকশা চালাতে খুব কষ্ট হয়। কয়েক মিনিট চালালেই শরীর ঘামে ভিজে যায়। তারপরও সংসারের জন্য রোদ মাথায় নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে।
নির্মাণশ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, রোদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু কাজ বন্ধ রাখলে পরিবার চালানো সম্ভব নয়।
দিনমজুর আবুল হোসেন বলেন, সারাদিন রোদে কাজ করি। গরমে বারবার পানি খেতে হয়। তারপরও কাজ না করলে সংসারে খাবার জুটবে না।”
ভ্রাম্যমাণ শরবত বিক্রেতা সোহেল আলী বলেন, গরম যত বাড়ছে, শরবতের বিক্রিও তত বাড়ছে। আগে দিনে ২০০ থেকে ৩০০ গ্লাস বিক্রি হতো। এখন প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ গ্লাস বিক্রি হচ্ছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, শনিবার সিলেটে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ। তবে মানুষের অস্বস্তির মূল কারণ শুধু তাপমাত্রা নয়, বাতাসের উচ্চ আর্দ্রতাও। আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কমে আবহাওয়া সহনীয় হবে। আর বৃষ্টি না হলে বর্তমানের ভ্যাপসা গরম অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, শুক্রবারের ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে একদিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি বেড়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেট বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, শনিবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সীমিত পরিসরে লোডশেডিং ছিল। এরপর তা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী ২১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ৪০ শতাংশ বা ১০ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের তথ্য সঠিক নয়; নির্দিষ্ট সময়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ কম পেলেই সাময়িক লোডশেডিং করতে হয়। তবে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পিডিবি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।



















