হবিগঞ্জের ভারতীয় সীমান্তবর্তী মাধবপুর উপজেলায় হাত বাড়ালেই মিলছে মরণনেশা মাদক। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ইয়াবা, ফেনসিডিল কিংবা গাঁজা সেবনের জন্য খুব বেশি দূর খুঁজতে হয়না মাদকসেবিদের। কোথায় কি ধরনের মাদক পাওয়া যায় সবাই জানে।
অনুসন্ধানে মিলেছে এমন বেশ কয়েকটি মাদকের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র ও পাইকারি বিক্রেতার নাম ঠিকানা। কিছু কিছু স্পটে অনেকটা প্রকাশ্যেই মাদকের বেচাকেনা ও সেবনের ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি স্পটের নিরাপত্তার জন্য আছে স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু লোক ও দালাল। এমনকি অনেক জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধেও আছে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। দালালরা চেহারা দেখেই বুঝতে পারেকে মাদকসেবী। এসব স্পটের বেশির ভাগ ক্রেতাই পরিচিত। অপরিচিত কেউ যেতে চাইলে পরিচিত কোন মাদকসেবীকে সাথে নিয়ে যেতে হয়। তাই মাদকসেবী ছাড়া অন্য কেউ এসব স্পটে প্রবেশের সুযোগ পায় না। মাদকের বড় বড় চালান যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠায়, বেশিরভাগ সময় তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রায়ই মাদকসহ মাদক পরিবহনের কাজে নিয়োজিত লোকজন ধরা পড়লেও গডফাদারদের আটকের কথা খুব একটা শোনা যায় না। মাঝেমধ্যে দুই একজন গডফাদার বা বড় মাদক কারবারি আটক হলেও দ্রুত সময়ের মধ্যে উচ্চআদালত থেকে জামিন নিয়ে তারা বেড়িয়ে আসে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মাঝেমধ্যে মাদকের চালান আটক করলেও রহস্যজনক কারণে বেশিরভাগ সময় কোন মাদক পাচারকারী বা কারবারীকে ধরতে পারেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় লোকজন জানান, স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন থেকে শুরু করে এসব দেখার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই চলে মাদক চোরাকারবার।
সম্প্রতি মাধবপুর উপজেলার ধর্মঘর ইউনিয়নের মোহনপুর, আলীনগর, কালিকাপুর, চৌমুহনী ইউনিয়নের রামনগর, কমলপুর, রাজনগর, বহরা ইউনিয়নের শ্রীধরপুর, কৃষ্ণপুর, শাহজাহানপুর ইউনিয়নের বনগাঁও, জালুয়াবাদ, তেলিয়াপাড়া চা বাগান, সুরমা ২০নং বস্তির সীমান্ত এলাকা ঘুরে মাদক চোরাচালানের এ চিত্র পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সীমান্তের মাদক ব্যবসায়ীদের বলা হয় মহাজন। মাদক আনার জন্য মহাজন যাদের নিয়োগ করেন, তাদের বলা হয় ‘ভারী’। সীমান্তের অবস্থা জানানোর জন্য ‘লাইনম্যান’ হিসেবে কাজ করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্সরা। ‘লাইন ক্লিয়ার’ অর্থ হচ্ছে মাদক আনার সুবিধাজনক সময়।
স্থানীয় বাসিন্দা, চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, এক যুগ আগেও মাধবপুর সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে পাচার হওয়া মালামালের তালিকায় গরু, লবণ, চিনি, সাইকেল, জিরা, কাপড়ের মতো পণ্যের প্রাধান্য ছিল। এখন লাভ বেশি হওয়ায় এসব পণ্যের বদলে আসছে মাদক, যার বেশির ভাগই ফেনসিডিল। এ ছাড়া আছে ইয়াবা, গাঁজা, মদ ও নেশা জাতীয় ইনজেকশন।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, মাধবপুর পৌরসভার সেমকো সিএনজি অটোরিকশা পাম্পের নিকট আলী আকবরের বাড়িতে ইয়াবা’র ব্যবসা চলে। এছাড়াও মাধবপুর পৌরসভায় অভিজিৎ পাল বড় মাদক ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচিত। ধর্মঘর ইউনিয়নের সোয়াবই গ্রামের ফুয়াদ হাসান সাকিব ও নিজনগর গ্রামের খোকন মিয়া ওরফে ফেন্সি খোকন এলাকায় কুখ্যাত মাদক ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচিত। চৌমুহনী ইউনিয়নের কমলপুর গ্রামের শাহজাহান মিয়া ও রামনগর গ্রামের মামুন মিয়া, বহরা ইউনিয়নের শ্রীধরপুর গ্রামের কাওসার মিয়া ও মামুন মিয়া, শাহজাহানপুর ইউনিয়নের লোহাইদ গ্রামের নুরুজ্জামান ও সুরমা চা বাগানের ২০নং বস্তির নয়ন রাজ প্রধান এবং জগদীশপুর ইউনিয়নের বেজুরা গ্রামের জাকির হোসেন ও রতন মিয়া এলাকায় বড় মাদক ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচিত। বাঘাসুরা ইউনিয়নের শাহ্ সুলেমান ফতেহ গাজী মাজারের আশপাশে কয়েকটি স্পটে গাঁজা বিক্রি হয়। এখানে রঘুনন্দন পাহাড়ের উপরে নিয়মিত বসে গাঁজার আসর। তেলিয়াপাড়া চা বাগানে তিনটি স্পষ্টে মাদকসেবীরা মাদক সেবন করতে আসে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সদরদপ্তর হিসেবে পরিচিত তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধ এলাকায় প্রায়ই দেখা যায় মাদকসেবীরা বসে থাকে ফেনসিডিল সেবনের জন্য।
এ ব্যাপারে মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমি এই থানায় আসার পর মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছি। গত তিন মাসে ২২ টি মাদক মামলায় ৩০ আসামি গ্রেফতার হয়েছে। ১৮৫ কেজি গাঁজা, ৩৭ বোতল বিদেশি মদ, ১২৯০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০০ বোতল স্কফ সেরাফ, ৩৮ বোতল ফেন্সিডিল জব্দ হয়েছে। কুখ্যাত মাদক ব্যাবসায়ী আলী আকবরসহ অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে।




















