সিলেটে অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চাকরি হারালেন কর্মকর্তা, শুরু হলো আইনি লড়াই

  • প্রকাশের সময় : ২৬/০৭/২০২৬ ০৭:২৫:৫১ AM

Share
2

বিগত সরকারের আমলে মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ছিল ওপেন সিক্রেট। কোনো ধরনের সঠিক মূল্যায়ন ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অবাধ অপচয় করা হয়েছে। এমনই এক প্রকল্প সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্প (এসএফপি)। হাজার কোটি টাকার ব্যয়ে নির্মিত এই মেগাকারখানাটি বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক চরম ব্যর্থতা ও বোঝা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও প্রকল্প পরিচালকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট শুরু থেকেই প্রকল্পটিতে ব্যাপক লুটপাট চালায়। তবে এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এক কর্মকর্তা চরম নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। জালিয়াতি ও অনিয়মে সায় না দেওয়ায় তাঁকে শুধু চাকরিচ্যুতই করা হয়নি, বরং সাজানো মামলা ও কারাবাসের মাধ্যমে তাঁর জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পরও সেই কর্মকর্তার দুর্ভোগের অন্ত ঘটেনি; বিচার পাওয়ার আশায় তাঁকে আজও প্রতিদিন আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী এই কর্মকর্তার নাম খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল, যিনি সর্বশেষ শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের হিসাব বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. হাইয়ুল কাইয়ুম একটি বিতর্কিত আদেশের মাধ্যমে তাঁকে চাকরিচ্যুত করেন। ওই আদেশে তাঁর বিরুদ্ধে ২২ লাখ ১৩ হাজার ৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে এক সপ্তাহের মধ্যে তা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর ও তাঁর পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল ঘটনার নেপথ্যে ছিল প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দুর্নীতিতে বাধা দেওয়া। চীন সরকারের ঋণসহ প্রায় ৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের অন্যতম বৃহৎ এই সার কারখানাটির সূচনালগ্ন থেকেই নানা ফন্দিফিকির শুরু হয়। সাবেক একাধিক মন্ত্রী ও প্রকল্প পরিচালকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট দরপত্র প্রক্রিয়াতেই জাল পারফরম্যান্স গ্যারান্টি ধামাচাপা দেয় এবং অস্বাভাবিক বেশি মূল্যে কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর অব্যবহৃত থাকা ৩২৯ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে পছন্দের ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল সিন্ডিকেটের মূল রোষাণলে পড়েন। অন্যায় আদেশে সায় না দেওয়ায় তাঁকে চাকরিচ্যুত করার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ভুয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। পরবর্তীকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে র‍্যাব ও সিআইডিকে ব্যবহার করে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক সাজানো অভিযান ও মামলা পরিচালনা করা হয়। ২০২২ সালে তাঁর বাসায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও জাল টাকা উদ্ধারের দাবি করে র‍্যাব, যা নিয়ে ব্যাপক ধোঁয়াশা ও বৈপরীত্য তৈরি হয়। রহস্যজনকভাবে অভিযানের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই দুদকের বিভিন্ন মামলার নথি উল্লেখ করে র‍্যাবের পক্ষ থেকে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ও প্রতারণাসহ মোট ৩০টি মামলা দায়ের করা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় দায়ের করা মামলাগুলোর এজাহার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির করা মামলার বক্তব্য ও টাইপিং স্টাইলে অদ্ভুত মেলবন্ধন রয়েছে। এমনকি এজাহারে ইকবালকে ‘এইচএসসি পাস’ এবং ২০০৫ সালে সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে যোগদানের তথ্য দেওয়া হলেও প্রাতিষ্ঠানিক নথি বলছে ভিন্ন কথা। ২০০৬ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পদোন্নতি ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই তিনি হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এবং নিয়োগের আগেই তাঁর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন ছিল। অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্তের বলিকাধা বানানোর এই দৃষ্টান্ত দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে।



সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
স্টাফ রিপোর্টার

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ২০২৬-০৭-২৬ ০৭:২৫:৫১