সিলেটে বালু লুটে সাংবাদিকদের বখরা!

  • প্রকাশের সময় : ২৫/০৭/২০২৬ ০৮:৫৭:১৩ PM

Share
15

সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে নদী জুড়ে চলছে বালু লুটের মহোৎসব। উপজেলার হাজিপুর, প্রতাপুর, আহারকান্দি, লুনি ও কন্যাজঙ্গল এলাকার নদ-নদীতে এই লুটপাট ও পরিবেশ ধ্বংসের তাণ্ডব চলছে। জেলা প্রশাসনের লিজ চুক্তি অনুযায়ী উপজেলায় মাত্র ৮৮.৭৮ একর এলাকায় বালুমহাল প্রদান করা হলেও সিন্ডিকেটটি পুরো উপজেলার প্রায় ১১০ কিলোমিটার জুড়ে নদীপথে তা বিস্তার করেছে।


​সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দিনের বেলা সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা থাকলেও ইজারাদার ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দিন-রাত নিষিদ্ধ ড্রেজার, বোমা মেশিন ও এজভেটর দিয়ে অবাধে বালু ও পাথর উত্তোলন করছে। বালুমহালের ইজারাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজনৈতিক বিভিন্ন দলের নেতাদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। ইজারার ৯, ১০, ১১ ও ১২ নম্বর শর্ত অনুযায়ী ড্রেজার বা পাম্প ব্যবহার করা, রাতে বালু তোলা, নদীর পাড়, আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষতি করা এবং লিজ 'সাবলিজ' (উপ-ইজারা) দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে ক্ষতিকর বোমা মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহারের ফলে পিয়াইন ও ডাউকি নদীর পারের অন্তত তিন কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিলীন হতে বসেছে ঘরবাড়ি, ঐতিহাসিক মসজিদ, খেলার মাঠ, কবরস্থান ও সরকারি রাস্তাঘাট।


​ইজারাদার প্রতিষ্ঠান 'মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ' আইন ভেঙে অন্তত ৪৩ জন স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকে অংশীদার করে অবৈধ সাবলিজের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। নির্ধারিত মূল্য ১ টাকা ৭১ পয়সার স্থানে ট্রাক ও নৌকা থেকে ৪ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রয়্যালটি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।


সাংবাদিকদের বখরা ও চাঁদার সুনির্দিষ্ট হিসাব

​অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ বালু উত্তোলন টিকিয়ে রাখতে ইজারাদার সিন্ডিকেট জেলা প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সাংবাদিক এবং জেলার তিনটি প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের নিয়মিত টাকা দিয়ে 'ম্যানেজ' করে আসছে। সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের নামে প্রতি সপ্তাহে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদা আদায়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। গত ১৬ জুলাই ২০২৫-এর একটি ফাঁস হওয়া তালিকা সূত্রে জানা যায়, সিন্ডিকেটটি প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নামে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা চাঁদা হিসেবে প্রদান করে।

ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী সাপ্তাহিক বরাদ্দের তালিকা:


  • সিলেট জিন্দাবাজার প্রেসক্লাব: সপ্তাহে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

  • প্রেসক্লাব (সুবিদবাজার): ৩ লাখ টাকা।
  • ইনজা: ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

  • অনলাইন প্রেসক্লাব: ৮০ হাজার টাকা।

  • গোয়াইনঘাটের ২৬৮ জন সাংবাদিকের নামে: ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

  • টিভি সাংবাদিক (পৃথকভাবে ৭ জন): ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।

  • পত্রিকার সাংবাদিকদের বরাদ্দ: প্রথম আলো, সমকাল, দিনকাল, মানবজমিন, খবরের কাগজ, আজকের পত্রিকা, কালের কণ্ঠ ও নয়া দিগন্তের সাংবাদিকদের নামে মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

  • ব্যক্তিগত পেমেন্ট: মুক্তাদিরের নামে একজনের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা এবং লোদীর নামে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি অন্য কয়েকজন সাংবাদিকের নামে পৃথকভাবে সপ্তাহে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের উল্লেখ রয়েছে।
  • 'বলদ' কোড খাত: তালিকায় 'বলদ' কোড নামে কয়েকটি বিশেষ খাতের কথাও উল্লেখ আছে, যার মধ্যে প্রথম বলদ প্রতি সপ্তাহে ২০ হাজার, দ্বিতীয় বলদ ১৫ হাজার, তৃতীয় বলদ ৮ হাজার, চতুর্থ বলদ ৫ হাজার এবং বাকি অন্যান্যদের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে ২ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।

প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা

​সার্বিক বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

​লাল পতাকা টাঙিয়ে সীমানা নির্ধারণ না করার অভিযোগ রয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীর বিরুদ্ধে। মাঝেমধ্যে মেশিন পুড়িয়ে দেওয়ার সাঁড়াশি অভিযান চালানো হলেও মূল অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়নি। বিদায়ী ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও সেকেন্ড অফিসার এসআই ফয়েজের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা ও বখরা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে অসন্তোষের মুখে ওসিকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে বিয়ানীবাজার থানা থেকে এসে নতুন ওসি ওমর ফারুক যোগ দিলেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কোনো পরিবর্তন আসেনি।


​অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে উচ্চ আদালতের রিট ও মন্ত্রণালয়ের স্মারকলিপি প্রদান করেছেন উপজেলার বাসিন্দা মফিজুর রহমান খানের ছেলে হিফজুর রহমান খান। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা একাধিক অভিযোগ দিলেও এডিসি (রেভিনিউ), বিভাগীয় কমিশনার, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হকের নীরবতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।​


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৭-২৫ ২০:৫৭:১৩