সিলেটে পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি খোলস বদল: বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কামরানের ‘বুঙ্গা’ সিন্ডিকেট, জিন্দাবাজার-লালাদিঘী পাড়ে অবৈধ পণ্যের পাহাড়

  • প্রকাশের সময় : ২৬/০৭/২০২৬ ০৮:২০:১৬ PM

Share
22

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সিলেটে রাতারাতি খোলস বদলে সচল হয়ে উঠেছে একটি বড় ধরনের অবৈধ ‘বুঙ্গা’ (সীমান্ত চোরাচালান) সিন্ডিকেট। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের ছায়াতল থেকে বেরিয়ে এসে এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে প্রকাশ্যে এই অবৈধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করার অভিযোগ উঠেছে কামরান নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। সীমান্ত গলে আসা চোরাই কাপড়, কসমেটিকস ও বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী লালাদিঘী পাড় এলাকা। এতে যেমন সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, তেমনি হুমকিতে পড়েছে স্থানীয় বৈধ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্রের সুনাম।
আওয়ামী লীগের ছায়া থেকে বিএনপির ছদ্মবেশ:
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত কামরানের স্থায়ী বাড়ি সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ছাগলি গ্রামে। তবে চোরাচালান ব্যবসা ও সিন্ডিকেট সুনির্দিষ্টভাবে পরিচালনার সুবিধার্থে তিনি বর্তমানে সিলেট মহানগরীর শাহপরাণ থানাধীন মেজরটিলা ইসলামপুর এলাকায় বসবাস করছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে কামরান সিলেট আওয়ামী লীগ নেতা রাহেল সিরাজের অনুসারী তুহিন আলমের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তৎকালীন সরকারের আমলে তুহিন আলমের ছত্রছায়ায় থেকেই তিনি সীমান্তজুড়ে চোরাচালান ব্যবসার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাতারাতি দল বদলে এখন তিনি বিএনপির নাম ব্যবহার করছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভুঁইফোড় এই অপরাধী বিএনপির নাম ব্যবহার করে মূলত নিজের অপরাধ ঢাকছে এবং দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
লালাদিঘী পাড়ের গোপন গুদাম ও জিন্দাবাজারের নেটওয়ার্ক:
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ চোরাই পথে আনা বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় ও বিদেশি কাপড়, কসমেটিকস ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্য মজুতের জন্য কামরান সিলেট নগরীর লালাদিঘী পাড় এলাকায় একটি বড় গুদাম ঘর ভাড়া নিয়েছেন। এই আস্তানা থেকেই তার পুরো চোরাচালান সিন্ডিকেটের মালামাল খালাস ও বণ্টন করা হয়। কেবল লালাদিঘী পাড়ই নয়, এই সিন্ডিকেটের চোরাই পণ্য নিরাপদে মজুত ও বিক্রির জন্য জিন্দাবাজারের বিভিন্ন নামী-দামী দোকান, হকার্স মার্কেট এবং স্থানীয় কয়েকটি গোপন গোডাউনকে (গুদাম) ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর কারণে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা:
কামরানের এই অবৈধ গুদাম ও সিন্ডিকেটের কারণে লালাদিঘী পাড় এবং জিন্দাবাজার এলাকার সাধারণ ও বৈধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লালাদিঘী পাড় এলাকার একাধিক সাধারণ ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা দীর্ঘদিন ধরে সততার সাথে সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করে আসছি। কিন্তু কামরান নামের এই যুবক বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এখানে চোরাচালানের কাপড় ও কসমেটিকস পণ্যের গুদাম তৈরি করেছে। প্রতিদিন শত শত অবৈধ মালামাল এখানে আনা-নেওয়া করা হয়। রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর কারণে আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছি না। এই অবৈধ গুদামের কারণে লালাদিঘী পাড়ের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্রের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।" ব্যবসায়ীরা অবিলম্বে এই অবৈধ গুদাম উচ্ছেদ এবং চোরাকারবারি কামরানের গ্রেফতার দাবি করেছেন।
রাজস্ব ফাঁকি ও প্রশাসনের ভূমিকা:
সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলা দিয়ে প্রতিদিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এই কোটি কোটি টাকার অবৈধ বুঙ্গা পণ্য সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এই সিন্ডিকেটের কারণে সরকার যেমন বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বাজারে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের কৃত্রিম ও অবৈধ প্রতিযোগিতা। স্থানীয় ও সচেতন মহলের জোর দাবি, কাস্টমস শুল্ক গোয়েন্দা, বিজিবি এবং সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিশেষ করে কোতোয়ালী ও শাহপরাণ থানা) যেন যৌথভাবে লালাদিঘী পাড়ের ওই গুদাম এবং জিন্দাবাজারের সরবরাহ চেইনে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে এই ছদ্মবেশী চোরাকারবারিকে আইনের আওতায় আনে।


সিলেট প্রেস / এফ


কমেন্ট বক্স
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রকাশ: ২০২৬-০৭-২৬ ২০:২০:১৬