সিলেটের মৌলভীবাজারে মনু নদীর বাঁধ ভাঙার পর এবার পার্শ্ববর্তী জেলা হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে ২০টি গ্রাম। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন সাড়ে ছয় হাজার মানুষ। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৮ হাজার ১৪০ জন। দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৩০০ মানুষ।
বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) রাত প্রায় ৯টার দিকে হবিগঞ্জ সদর লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বন্যার পানি আশপাশের গ্রামগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের অসংখ্য বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়। অনেক পরিবারের ঘরে কোমরসমান পানি উঠে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায়ও বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বন্যার পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতেও বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়৷ নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড় ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, আবার অনেকে স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন।
এ অবস্থায় শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ জি কে গউছ।
পরিদর্শনকালে হুইপ বলেন, ‘দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকার ও তিনি ব্যক্তিগতভাবে থাকবেন বলেও আশ্বাস দেন।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে। মুড়ি, চিড়া, আলু, ডাল, বিস্কুট ও মোমবাতি সমন্বয়ে প্রস্তুত এক হাজার ৫২টি ত্রাণ প্যাকেট ইতোমধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।’
বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল হক, হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। পরে স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে মাইকিং করে প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।’
জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জের পাঁচটি ইউনিয়নে ছয় হাজার ৪৪৫ জন পানিবন্দি রয়েছেন। বন্যায় ২৮ হাজার ১৪০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে দুইটি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩০০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দুর্গত মানুষের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ লাখ টাকা, ১০০ মেট্রিক টন জিআর চাল এবং এক হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৯টি উপজেলায় এক হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনা খাবার উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ১ লাখ টাকা ও ২০ মেট্রিক টন চাল, বানিয়াচং উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা ও ৫ মেট্রিক টন চাল এবং বাহুবল উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা ও ৫ মেট্রিক টন চাল উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত মুড়ি, চিড়া, আলু, ডাল, বিস্কুট ও মোমবাতি সমন্বয়ে ১ হাজার ৫২টি ত্রাণ প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের মজুদে রয়েছে ৩ লাখ টাকা, ৭০ মেট্রিক টন জিআর চাল এবং ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে৷
এদিকে সিলেটের মৌলভীবাজারে রাজনগর উপজেলায় মনু নদীর বাঁধ ভেঙে চারটি ইউনিয়নের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নদীভাঙনে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। স্রোতের টানে প্রাণ হারিয়েছেন এক বৃদ্ধ।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর চাঁদনীঘাট অংশে বিপৎসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। এছাড়া ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে পাশের জেলা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় সুরমা নদীর পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমাসহ পার্শ্ববর্তী নদনদীর পানি আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে।



















