ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে সিলেট বিভাগজুড়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এরই মধ্যে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৬০টি গ্রাম। সিলেট ও সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও দ্রুত বাড়ছে। এদিকে মৌলভীবাজারে বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত আশরাফ আলী ওরফে আশই মিয়া (৭০) মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয়দের ধারণা, বাড়ির পাশে বন্যার পানির স্রোতে পড়ে তিনি তলিয়ে যান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানিয়েছে, ভারতের মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিন সিলেট বিভাগের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
মৌলভীবাজারে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত ৩৫ গ্রাম
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে রাজনগর উপজেলার আকুয়া এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের একটি বড় অংশ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। এতে টেংরা ইউনিয়নের প্রায় ৩৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
প্লাবিত গ্রামের মধ্যে রয়েছে উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুর, কাঁচারী, একামধু, কান্দিরকুল ও পণ্ডিতনগর। এ ছাড়া রামভদ্রপুর, সালন, পাইকপাড়া, ডেফলউড়া, গণেশপুর, আকুয়া, কোনাগাঁও, টগরপুর ও ভাঙ্গারহাট এলাকাও বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মতিন মিয়া বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
হবিগঞ্জে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত ২৫ গ্রাম
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সদর উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যায়। এতে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হঠাৎ করে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় অর্ধলাখের বেশি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজারসংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে মাছুলিয়া পয়েন্টের শহররক্ষা বাঁধ। স্থানীয়রা বাঁশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন।
হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশেও পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পানি আরও বাড়লে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, পানি আরো বাড়লে নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তবে বৃষ্টিপাত কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক ডা. জিএম সরফরাজ জানান, বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। জেলার জন্য ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল এবং ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে।
সিলেট ও সুনামগঞ্জে বাড়ছে নদীর পানি
পাউবো সূত্র জানায়, সিলেট জেলার ১১টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টেই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কানাইঘাটে সুরমা নদী, জকিগঞ্জের অমলসিদে কুশিয়ারা এবং ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।
পাউবোর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘সিলেটের নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। সিলেটে বন্যার বড় কারণ মেঘালয়ের অধিক বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল। আগামী অন্তত তিনদিন মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাত হবে। সুতরাং সিলেট জেলায় বন্যা পরিস্থিতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করছি।’
অন্যদিকে সুনামগঞ্জে এখনো নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও তা দ্রুত বাড়ছে। জেলা প্রশাসন প্রতিটি উপজেলায় তথ্যকেন্দ্র চালু করেছে এবং আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে নির্দেশনা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘সুনামগঞ্জ ও ছাতক পয়েন্টে সুরমার পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে আছে। সুনামগঞ্জে ৭৭ মিলিমিটার ও লাউড়েরগড় পয়েন্টে ১০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে যাদুকাটা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে আছে।’



















