ওষুধের তীব্র সংকট ও জনবল ঘাটতি

মৌলভীবাজারে ব্যাহত ১১ লাখ মানুষের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা

  • প্রকাশের সময় : ০৬/০৭/২০২৬ ০৬:২৮:২৯ AM

Share
3

​তীব্র ওষুধসংকট, জনবল ঘাটতি এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের কারণে মৌলভীবাজার জেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ১১ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীরা।


​নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিকে ২২ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্লিনিক এখন প্রায় ওষুধশূন্য। কোথাও কোথাও শুধু প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল (মেট্রিল) ও খাবার স্যালাইনের মতো সীমিত কিছু প্রাথমিক ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান।

​সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাত উপজেলায় মোট ১৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে ছয় দিন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া সপ্তাহে তিন দিন করে স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্লিনিকে সিএইচসিপি ছাড়া অন্য কোনো কর্মীকে পাওয়া যায় না।

​সম্প্রতি সরেজমিনে কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার শ্রীসূর্য্য কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, সিএইচসিপি দায়িত্বে থাকলেও দুপুর পর্যন্ত কোনো রোগী আসেননি। অন্যদিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার লাইয়ারকুল, কাকিয়াছড়া ও সাইটুলা কমিউনিটি ক্লিনিক এবং রাজনগর উপজেলার সালন কমিউনিটি ক্লিনিক দুপুরের আগেই বন্ধ পাওয়া যায়।

​স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্লিনিক নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার অনেক রোগী দূর-দূরান্ত থেকে এসেও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন।

কমলগঞ্জের বলেন ​সাবিনা আক্তার “এক বছর ধরে আগের মতো কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না। অ্যান্টিবায়োটিকও নেই। তাই এখন অনেকেই কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।”
রাজনগরের নিদনপুর বাসিন্দা ​ফাতিহা বেগম বলেন “আমি আলসারের রোগী। টাকার অভাবে নিয়মিত ওষুধ কিনতে পারি না। গত চার মাস ধরে ক্লিনিকে গিয়ে কোনো ওষুধ পাইনি।”

স্থানীয় বাসিন্দা​ইমাম আব্দুন নুর  বলেন “আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এই ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ওষুধ না থাকায় সবাই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে। এতে দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

​মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শ্যামেরকোনা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জান্নাত আরা বেগম বলেন, “ওষুধের তীব্র সংকট চলছে। রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে না পারায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন, অনেক সময় আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন।”

​তবে সংকট নিরসনে চেষ্টা চলছে জানিয়ে মৌলভীবাজার জেলা সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রুবেল আহমেদ বলেন, “ওষুধসংকট নিরসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, শিগগিরই সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।”


​শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বরাদ্দের ঘাটতির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আগে আমাদের উপজেলায় তিন কার্টন ওষুধ বরাদ্দ আসত, এখন মাত্র এক কার্টন আসে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।”

​এ প্রসঙ্গে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, “কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আগের তুলনায় ওষুধের বরাদ্দ কমে গেছে। পাশাপাশি জনবল সংকটও রয়েছে।”


​স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং ক্লিনিকগুলোর নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা না হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল। তাই প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এই সংকট দ্রুত সমাধানে সরকারের কার্যকর ও জরুরি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রকাশ: ২০২৬-০৭-০৬ ০৬:২৮:২৯