আওয়ামী লীগ সরকার আমলের মন্ত্রী ও এমপির দ্বন্দ্বে বন্ধ সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কারকাজ শুরু করতে অবৈধ দখলমুক্ত করার কাজ শুরু করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রেলপথ বন্ধ থাকার সুযোগে রেলের জায়গা দখল করে দুই সহস্রাধিক পাকা, আধা পাকা স্থাপনা তৈরী হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ ফেব্রয়ারি) একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সিলেটের কামালবাজার থেকে খাজাঞ্চি রেলস্টেশন পর্যন্ত ৫৬টি স্থাপনা উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে এ অভিযান শুরু করা হয়েছে। রেলপথসহ রেলওয়ের জায়গায় অবৈধ দখল মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সিলেট থেকে ছাতক পর্যন্ত এ অভিযান চলবে।
এর আগে গত ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন সরেজমিনে রেলপথ পরিদর্শন করে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে রেলপথ সংস্কার কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, চলতি বছর সংস্কার শেষে আগামী বছর রেলপথ চালু হবে। মহাপরিচালক বলেছিলেন, রেলপথ বন্ধ থাকার মধ্যে বন্যায় রেললাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এটি সংস্কারের জন্য বিগত সরকারের আমলে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। ওই প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদন শেষে দরপত্রের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আশা করি, ফেব্রুয়ারি মাসে সংস্কারকাজ শুরু হবে। কাজ সম্পন্ন করতে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। কাজ শেষ হলে আগামী বছরের শুরুতে চালু হবে ছাতক-সিলেট ট্রেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সিলেট-ছাতক রেলপথ সম্প্রসারিত হওয়াকে কেন্দ্র করে বন্ধ হয়ে আছে এই পথের রেল-যাতায়াত। রেলপথটি সুনামগঞ্জ পর্যন্ত যাবে বলে অনেক আগে একটা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সঙ্গে ছাতক-দোয়ারাবাজার নির্বাচনি এলাকার সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে এই প্রকল্পের কাজ আর এগোয়নি। করোনার সময় রেলপথটিও বন্ধ হয়ে যায়। পরে দেশের সবকটি লাইন সচল হলেও বন্ধ থাকে সিলেট-ছাতক রেলপথ। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই মন্ত্রীও নেই, এমপিও নেই। তবু চালু হয়নি রেলপথ।
ব্রিটিশ আমল থেকে শিল্পশহর হিসেবে ছাতকের খ্যাতি। সে সময় সিলেট থেকে ছাতক পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারিত হয়েছিল বাণিজ্যিক কারণে। এরপর পরিকল্পনা ছিল সেখান থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহর (তৎকালীন মহকুমা) পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার। আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলমন্ত্রী থাকাকালে সেই পুরোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে রেল মন্ত্রণালয় থেকে তিনি সরে গেলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।
নতুন পরিকল্পনায় রেললাইনে ছাতককে বাদ দিয়ে গোবিন্দগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জে নেওয়ার কথা বলা হয়। এর প্রতিবাদ জানান সেই সময়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক। মন্ত্রী-এমপির দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। এ নিয়ে গত বছরের ২৩ নভেম্বর খবরের কাগজে ‘মন্ত্রী-এমপি নেই, তবু দ্বন্দ্বে বন্ধ সিলেট-ছাতক রেলপথের কাজ’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল।
রেলওয়ে প্রকৌশল শাখার একটি সূত্র জানায়, ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় রেলওয়ে মহাপরিচালক সরেজমিন পরিদর্শন করেন। সরেজমিন পরিদর্শনকালে মহাপরিচালকের ঘোষণা অনুযায়ী ফেব্রয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে সংস্কারকাজ শুরু করতে অবৈধ দখলমুক্ত অভিযান শুরু হয়েছে। সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা ও বিশ্বনাথ উপজেলা হয়ে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা পর্যন্ত যাওয়া রেলপথের জায়গা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার সুযোগে অবৈধ দখল হয়েছে। সিলেট থেকে ছাতক পর্যন্ত সহস্রাধিক স্থাপনার এসব দখল নিজ থেকে গুটিয়ে নিতে গত বছরের নভেম্বর মাসে রেলওয়ে সিলেট ও ছাতক স্টেশন কর্তৃপক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রায় তিন মাসে দখলদার তার দখল গুটিয়ে না নেওয়ায় মঙ্গলবার দক্ষিণ সুরমার এসি ল্যান্ড (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) আলিম উল্লাহ খানের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান হয়।
সিলেট থেকে ছাতক পর্যন্ত রেলপথ ও রেলের জায়গা দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে জানিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট আলিম উল্লাহ খান বলেন, পাকা ভবনসহ বড় বড় ৫৬টি স্থাপনা আমরা উচ্ছেদ করেছি। আরও কিছু দখল চিহ্নিত করে সেগুলো দখলদারদের নিজ থেকে সরাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে কিছু জমি আছে রেলওয়ে থেকে ইজারা দেওয়া। সেগুলো রেখে ইজারা বহির্ভূত জায়গা থেকে স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। পুরো রেলপথ অবৈধ দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান চলবে।
সিলেট-ছাতক রেলপথের কামালবাজার এলাকায় অভিযান চলাকালে দেখা গেছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে রেলওয়ের কর্মকর্তাসহ কর্মীরাও অংশ নিয়েছিলেন। দখলদার পক্ষ নানা অজুহাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কামালবাজার এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক আহমদ অবৈধ স্থাপনা নিজ থেকে সরিয়ে নিতে সময় প্রার্থনা করেন। তিনি অভিযানকারীদের বলেন, কিছু কিছু স্থাপনা আছে, যেগুলো কাগজপত্রে অর্ধেক অবৈধ। আমরা এগুলো সরিয়ে নিতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় চেয়েছি।
তবে এ রকম সময়ক্ষেপণ উচ্ছেদ অভিযান বাধার সৃষ্টি করবে জানিয়ে সিলেট-ছাতক রেলপথ সচল হওয়ার পক্ষে থাকা স্থানীয় জনসাধারণ উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখার কথা বলেন। এ ব্যাপারে পরিবেশাবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) কর্মী সাজিদুর রহমান সুহেল বলেন, ‘আমরা চাই রেলপথ সচল করার ক্ষেত্রে সব বাধা দূর হোক। মূলত রেলপথ বন্ধ থাকার সুযোগে অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে। সেগুলো অপসারণে রেল কর্তৃপক্ষ গত বছরের নভেম্বর মাসে নোটিশ দিয়েছেন। উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে মাইকিং করে প্রচারণা চালানো হয়েছে। এ অবস্থায় উচ্ছেদ অভিযান সফল করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তাই আমরা চাই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের অভিযান সফল হোক।’
সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক




















