আইন, শাসন, বারণ– কোনো কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের মাটিখেকোদের। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমির ওপরিভাগের
উর্বর মাটি বা টপ সয়েল খুবলে নিচ্ছে স্থানীয় মাটিখেকো সিন্ডিকেট।
কখনও কৌশলে, কখনও প্রভাব খাটিয়ে, আবার কখনও বা সরল কৃষকদের অর্থের লোভ দেখিয়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে তাদের জমির উর্বর মাটি। এতে করে উর্বরতা হারিয়ে ক্রমেই নিষ্ফলা হয়ে পড়ছেন এখানকার কৃষি জমি। অপরদিকে বাড়ছে ভূমির ক্ষয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানেও থামছে না ফসলি জমি থেকে মাটি কাটা।
উপজেলা সদর ইউনিয়নের শাইলগাছ, মীরেরপাড়া, জাজিউতা, নরপতি, বাগবাড়ি; সাটিয়াজুরী ইউনিয়নের উসাইনগর, কাজিরখিল; রানীগাঁও ইউনিয়নের চাটপাড়া, গাভিগাঁও; শানখলা ইউনিয়নের লালচান্দ, বড়কুটা, হলহলিয়া, বদরগাজী; হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর, আদ্যপাশাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাটিখেকো চক্রের ভয়ালকাণ্ডের নজির; যার ফলে নানামুখী সংকটে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও এখানকার পরিবেশ-প্রকৃতি।
উপজেলা সদর ইউনিয়ন, শাইলগাছা, সাটিয়াজুরীসহ কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় সেখানকার কৃষিজমিগুলো থেকে এক্সক্যাভেটরের মাধ্যমে দিনের বেলাতেই কেটে নেওয়া হচ্ছে টপ সয়েল। এসব মাটির অধিকাংশই বিক্রি হচ্ছে সেখানকার ইটভাটাগুলোতে। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে গত এক সপ্তাহে অন্তত দু’জনকে কারাদণ্ড ও দুই লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করার পরও থেমে নেই ফসলি জমির বুকে চালানো মাটিখেকোদের তাণ্ডব। চক্রের সদস্যরা অবাধে ফসলি জমির মাটি কেটে ট্রাক্টরে করে সেগুলো ইটভাটায় নিয়ে বিক্রি করছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে তাদের এ ব্যবসা জমে ওঠে। এতে করে ফসল উৎপাদনের সক্ষমতা হারানোর কারণে দিন দিন অনাবাদি জমির পরিমাণ বাড়ছে।
জমি থেকে মাটি পরিবহনের সময় মাটিবোঝাই ভারী ট্রাক্টরের চাপে এসব এলাকার গ্রামীণ ও মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাঙা সড়কের কারণে বাড়ছে ধুলো-বালি আর মানুষের শ্বাসকষ্টজনিত রোগের সমস্যা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক জানান, স্বেচ্ছায় রাজি না হলে জোর করে তাদের জমির মাটি কেটে নেয় মাটি ব্যবসায়ী চক্রের সদস্যরা। এতে করে জমির পাড় ভেঙে পড়ছে। ধরে রাখা যাচ্ছে না সেচের পানি। তাদের ভারী ট্রাক্টরের চাকা খুবলে নিচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা ইউনিয়ন কর্তৃক নির্মিত সড়কগুলো। আইনের চোখ রাঙানি বা প্রশাসনের হুশিয়ারি কিছুই আমলে নিচ্ছে না তারা।
স্থানীয় গ্রামগুলোর দুই বা তিন ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে বিক্রির হিড়িক পড়েছে সম্প্রতি। এছাড়া খোই নদীর চর কেটে মাটি উত্তোলন করছে একটি চক্র। আর্থিকভাবে সাময়িকভাবে লাভবান হওয়ার আশায় অনেক কৃষক তাদের জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাপকহারে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
উপজেলা স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলা দেশের শস্যভান্ডারের আওতাভুক্ত। এ অঞ্চলের অধিকাংশ জমিই উর্বর পলি মাটিসমৃদ্ধ। এসব জমিতে বছরে দুটি মৌসুমে ধান, সরিষা ও শীতকালীন ব্যাপক সবজি উৎপাদন হয়। তবে কিছু অসাধু মাটি ব্যবসায়ী কৃষকদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এসব জমির টপ সয়েল কিনে নিচ্ছে। এতে করে এসব এলাকায় ভয়াবহ অনুর্বরতা ও ফসল উৎপাদনে ঘাটতি সৃষ্টির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় কিছু মাটি ব্যবসায়ী প্রতিবছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে মার্চ পর্যন্ত মাটির ব্যবসা করে। তারা কৃষকদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে জমির এক থেকে দেড় ফুট মাটি কিনে নিয়ে চড়া দামে ইটভাটায় বিক্রি করে। এছাড়া বাড়ি তৈরিতে মাটি ভরাট প্রয়োজন হলেও অনেকে এসব মাটি ব্যবসায়ীর দ্বারস্থ হন। অল্প সময়েই মাটি ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা রোজগার করে। আইন অমান্য করে এসব কর্মকাণ্ড চলছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বন্দের জমিতে।
চুনারুঘাট কৃষি কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলাম জানান, টপ সয়েল জমির প্রাণ। জমির ওপরের আট থেকে ১০ ইঞ্চি হলো টপ সয়েল। ওই অংশেই থাকে মূল জৈবশক্তি। কৃষকরা জমির টপ সয়েল বিক্রি করে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছেন। মাটি বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে তারা জমির উর্বরা শক্তিই বিক্রি করে দিচ্ছেন। জমির এ ক্ষতি ১০ বছরেও পূরণ হবে না। যেভাবে মাটি বিক্রি হচ্ছে তাতে করে ফসল উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে।
স্থানীয় মাটি ব্যবসায়ী ফিরুজ, রাসেল, সজলসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, অনেক দিন ধরেই মাটি কেনাবেচার ব্যবসা করছেন তারা। এতে জমির কোনো ক্ষতি হয় না। দীর্ঘদিন ধরে জমিতে পলি পড়ে পড়ে উঁচু হয়ে যায়। ওই উঁচু জমি থেকে মাটি কেটে তারা কৃষকের উপকারই করছেন। এতে কৃষক নগদ টাকাও পান, জমির ফসলও ভালো হয়।
বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, জমির মাটি কে বা কারা বিক্রি করেন তাদের তা জানা নেই। এসব বিষয়ে তাদের কিছু করারও নেই।
চুনারুঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুব আলম জানান, অবৈধভাবে মাটি ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে।




















