মৌসুমের শুরু থেকেই হিম বাতাস আর কনকনে ঠান্ডায় দাপট দেখাচ্ছে শীত। কিন্তু তাতে ভরা মৌসুমেও কমছে না সবজি বাজারের উত্তাপ। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির দাম। দেশের বিভিন্ন এলাকার মতো একই পরিস্থিতি বানিয়াচংয়ে। পর্যাপ্ত উৎপাদন এবং মজুত থাকার পরেও সবজির এমন দামের কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না ক্রেতারা। মাছ, মাংস, ডিম আগেই নাগালের বাইরে। এতে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর সবজিতেও স্বস্তি মিলছে না।
সোম থেকে মঙ্গলবার বানিয়াচং সদরের বেশ কয়েকটি কাঁচাবাজার ও সবজির আড়ত ঘুরে দেখা গেছে শাকসবজির ঊর্ধ্বমুখী দামের চিত্র। এক সপ্তাহের ব্যবধানে স্থানীয় বাজারগুলোতে কাঁচামরিচের কেজি পৌঁছেছে ১৫০ থেকে ২২০ টাকায়। ৪৫ টাকা কেজি বেগুন, ৫০ টাকা করলা আর ৩০ টাকা কেজির আলুর দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ৭০ টাকা কেজির টমেটো ৮০ টাকা, ৫৫ টাকার শিম ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, ৪০ টাকার পটোল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, ২০ টাকা কেজির শসা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ৩৫ টাকার বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ফুলকপি ৪০ টাকা থেকে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৭৫ টাকা আর ৩৫ টাকা কেজির বাঁধাকপি ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন বাজারে পণ্য ভেদে গড়ে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা করে বেড়েছে সব ধরনের সবজির দাম।
মৌসুমের সবচেয়ে সহজলভ্য এসব সবজির সঙ্গে একইভাবে দাম বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের শাক, লেবু, লাউ, গাজর, ধনিয়া পাতাসহ সব শাকসবজির দাম। এ ছাড়া এখনও নাগালে আসেনি পেঁয়াজ আর রসুনের ঝাঁজ। শাকসবজির বাইরে নিম্ন আয়ের মানুষের পেটে-ভাতে টিকে থাকার অন্যতম অবলম্বন ডিমের দাম বাড়াও অব্যাহত রয়েছে। একবারে হাঁস ও মুরগির ডিম হালিতে বাড়ানো হচ্ছে ৩-৪ টাকা। নজরদারি বাড়ালে কমানো হয় এক থেকে দুই টাকা। এভাবে সুকৌশলে বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে অদৃশ্য চক্র।
বানিয়াচংয়ের বাজারগুলোতে প্রতি হালি হাঁসের ডিম ৬৫ থেকে বেড়ে ৭০ টাকা এবং লেয়ারের (লাল মুরগি) ডিম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫ টাকা হয়ে গেছে। এদিকে পেঁয়াজের দাম এখনও সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজিতে।
খুচরা সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনও পাইকারি বাজারে পর্যাপ্ত শীতের সবজি পর্যাপ্ত আসেনি। তাই দাম বেশি। সবজির মজুত বাড়লে দাম সহনীয় হয়ে যাবে। তবে পাইকারি বাজারের আড়তগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
ব্যবসায়ী আব্দুল আওয়াল জানান, এখনও পুরো শীত পড়েনি। তাই চাহিদা অনুযায়ী সবজির সরবরাহ ও মজুত নেই। সে কারণে দাম কিছুটা বেশি। ব্যবসায়ীরা এমন কথা বললেও দোকানে সাজানো সবজির পসরা বলছে ভিন্ন কথা।
এদিকে শাকসবজির সঙ্গে বেড়েছে চালের দামও। চাল ব্যবসায়ী শরীফ উল্লাহ জানান, মোটা চালের দাম বাড়তি যাচ্ছে বাজারে। এতে বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। এ পর্যন্ত মোটা ও সরু চাল পাওয়া যেত কেজিপ্রতি ৩৫ টাকায়, কিন্তু এখন ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তবে চালের দাম বাড়ার কারণ বলতে পাড়ছেন না এসব ব্যবসায়ী। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১৫ টাকা।
অন্যদিকে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা। কয়েক দিন আগেও এক কেজি ব্রয়লার বিক্রি হয়েছে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে।
মুরগি ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া জানান, মুরগির খাবারের দাম বাড়ায় খামারিরা দাম বাড়িয়েছেন। বাজারমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষক আসাদুজ্জামান জানান, চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে বাজারে পর্যাপ্ত সবজির সরবরাহ রয়েছে। তার পরও তারা সংকটের কথা বলে দাম বাড়াচ্ছেন। এখন প্রকাশ্যেই চলছে বাজারে সিন্ডিকেটবাজি। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকার ও প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের অসহায়ত্বের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এর কারণ মানুষ ভালো করেই জানে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, কার্যকরী বাজার তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। তদারকির নামে যেটা হচ্ছে সেটা কর্তৃপক্ষের হাজিরা দেওয়া। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বাজার সিন্ডিকেটের লাগাম ধরে আছেন। সরকার ও প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েও তাদের সামাল দিতে পারছে না, নাকি সামাল দিতে চাচ্ছে না– এমন প্রশ্নও ছুড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
বানিয়াচং ভোক্তা অধিকার পরিষদের সভাপতি শাহিবুর রহমান জানান, মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফার প্রবণতা বেড়েছে। আর ভোক্তারা সময়ের সঙ্গে বেশি দামে পণ্য কেনায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। এক কথায় সিন্ডিকেট শতভাগ সফল। তাদের বিরুদ্ধে নানা তৎপরতা আর পদক্ষেপে ব্যস্ত সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট, সাধারণ মানুষকেই এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। ভোক্তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করা উচিত।




















