আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেই সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনে ভোটের লড়াই জমানোর জোর চেষ্টা চলছে। সবক’টি আসনেই বিএনপি বা চারদলীয় জোটের সাবেক এমপি কিংবা বিএনপির প্রার্থী হয়ে অতীতে ভোটে লড়েছেন দলছুটদের প্রার্থী হিসেবে ভোটে নামানোর দৌড়ঝাঁপ চলছে।
এসব আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও নেতাদের ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থার দায়িত্বশীলদের দেওয়া তথ্য হতে এমনটাই জানা গেছে।
ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিলেন রফিক চৌধুরী। বর্তমানে তিনি বিকল্পধারার কেন্দ্রীয় নেতা। ধর্মপাশার এই রাজনীতিবিদের পরিচ্ছন্ন ইমেজ থাকলেও বেশ কিছুদিন হয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় তিনি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে এক সময় যারা বিএনপির ঘনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন, তারাও এখন তাঁকে ছেড়ে অন্য নেতাদের কর্মী হয়ে কাজ করছেন।
এ আসনে জাতীয় পার্টির তিন নেতা মনোনয়ন চাইলেও দলের মনোনয়ন পেতে পারেন জামালগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সেক্রেটারি ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান। এখানে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক শক্তি উল্লেখ করার মতো নয়। আবদুল মান্নানেরও ব্যক্তিগত পরিচিত নির্বাচনী এলাকার চার উপজেলায় নেই বললেই চলে। এর পরও ভোটের মাঠ গরম করতে এমন প্রার্থীদের মাঠে নামানোর চেষ্টা চলছে।
দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির ডাকসাইটে নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে কিংস পার্টি বা অন্য কোনো দলের বরাতে প্রার্থী হওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। নাছির উদ্দিন চৌধুরী ফোন না ধরায় এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য জানা যায়নি। তবে তাঁর ভাই উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুক চৌধুরী জানিয়েছেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে ভোটে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ভাইয়েরও এমনই সিদ্ধান্ত বলে নিশ্চিত জানেন তিনি। দল নির্বাচনে না গেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করে দেন মাসুক চৌধুরী।
এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে পারেন আলী হোসেন সরকার নামে এক দলীয় নেতা। দিরাই-শাল্লায় জাপার এই মনোনয়নপ্রত্যাশীরও উল্লেখ করার মতো পরিচিতি নেই। শাল্লার বাসিন্দা আলী হোসেন ব্যবসা করেন সিলেটে। সিলেট জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক তিনি।
দিরাই উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম সর্দার জানান, আলী হোসেন সরকারকে কোনোদিন দেখেননি তিনি। তবে ভোটের মাঠে এই নেতাকে দেখা যেতে পারে বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে।
জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা শাহীনুর পাশা। মাওলানা শাহীনুর পাশা এর আগে ২০০৫ এর উপনির্বাচনসহ পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে চারবার বিএনপি-জামায়াতের জোটের প্রার্থী হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন। একবার করেছেন নিজের দলের প্রতীক খেজুরগাছ নিয়ে। প্রয়াত জাতীয় নেতা আবদুস সামাদ আজাদের মৃত্যুর পর ২০০৫-এর উপনির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে সামান্য ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দুই বছরের জন্য এমপি হয়েছিলেন মাওলানা শাহীনুর পাশা।
এ আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেতে পারেন উপজেলার ঘুষগাঁওয়ের বাসিন্দা জগন্নাথপুর উপজেলা যুব সংহতির সাবেক সভাপতি ও যুক্তরাজ্য জাতীয় পার্টির নেতা তৌফিক আলী মিনার। মিনার এক সময় পরিচিত ফুটবলার ছিলেন। এ জন্য তাঁর কিছুটা পরিচিতি আছে নির্বাচনী এলাকাজুড়ে। এ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ভোট উৎসব কিছুটা জমতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সদর-বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৪ আসনে জাপার প্রার্থী হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে বর্তমান সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। এটা অনেকটা নিশ্চিত বলেই জানিয়েছেন জাপা নেতারা। এ ছাড়া কিংস পার্টি হিসেবে পরিচিত বিএনএমের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য দেওয়ান শামছুল আবেদীন এই আসনে দলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। দেওয়ান শামছুল আবেদীন এর আগে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপাসহ বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে একাধিকবার নির্বাচন করেছেন। তিনি সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে এমপি হয়েছিলেন ১৯৭৯ সালে। ১৯৮৬ সালে সুনামগঞ্জ-৪ আসনে জাপার প্রার্থী হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে একই আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন তিনি। ২০০১ সালে সুনামগঞ্জ-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পরাজিত হন শামছুল আবেদীন। এর পর ২০০৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।
এ আসনে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী প্রার্থী দিলে ভোটের লড়াই জমবে বলে মনে করেন জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক মাহবুবুল হাসান শাহীন। শাহীন জানান, বিএনপি নির্বাচনে না এলেও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় প্রার্থী থাকলে এখানে ভোট উৎসব জমে উঠবে।
ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৫ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে ভোটে থাকবেন বিগত জাতীয় নির্বাচনে গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আয়ুব করম আলী। গণফোরাম নির্বাচনে না গেলেও ভোটে থাকবেন করম আলী। এ ছাড়া এই আসন থেকে নাজমুল হুদা হিমেল জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেতে পারেন বলে জানিয়েছেন দলের দায়িত্বশীলরা। এখানেও ভোটের লড়াই জমবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী গণফোরাম নেতা আয়ুব করম আলী শনিবার বিকেলে এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন দল নির্বাচনে না গেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন তিনি। এদিকে জাতীয় পার্টির জেলা আহ্বায়ক পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ এমপি জানিয়েছেন, ২৭ নভেম্বরের আগে কোথায়, কে দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখ্ত পলিন জানান, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যায়নি কে কোথায় দলীয় প্রার্থী হচ্ছেন। রোববার এটি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক




















