‘১১টি সিরিজে ২২০ ডিজিটের টোকেন নম্বর। বুড়ো মানুষ, নম্বর না টিপলে অন্ধকারে থাকতে হবে ভয়ে রীতিমতো প্রস্তুতি নিয়ে টুলের ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ শুরু করলাম। নম্বর টিপা শুরু করলে কয়েকবার মোবাইল স্কিনের পাওয়ার অফ হয়ে যায়, স্কিনে আলো এনে আবারও যুদ্ধ শুরু। ২২০টি বুলেট একই লক্ষ্যবস্তুতে ফেলা কঠিন। ভুল হয়ে যায়। এক পর্যায়ে একটি সিরিজ শেষ করে সবুজ বোতামে চাপ দিতেই অ্যালার্মের মতো করে মিটারটি চিৎকার করতে শুরু করল। পরে জানতে পারলাম, এই সতর্ক সংকেতের অর্থ হলো মিটার লক হয়ে গেছে। এখন বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে মিটার আনলক করতে হবে। পরে আবার শুরু করতে হবে সেই একই যুদ্ধ।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা এক পোস্টে প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জের যন্ত্রণার কথা এভাবেই বর্ণনা করেন সুনামগঞ্জ শহরের নতুনপাড়া আবাসিক এলাকার বাসিন্দা কুমার সৌরভ। মঙ্গলবার ফেসবুকে দেওয়া তাঁর এই পোস্টে ডিজিটাল দেশে অ্যানালগ বিদ্যুৎ মিটারের ভোগান্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কুমার সৌরভের এই ফেসবুক স্ট্যাটাস অসংখ্য ফেসবুক বন্ধু শেয়ার করেছেন। একই সঙ্গে নিজেদের বাড়ির প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জের যন্ত্রণার কথাও জানিয়েছেন তারা।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সুনামগঞ্জের সহসভাপতি আইনজীবী খলিল রহমান কমেন্টে লেখেন, এটা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তামাশা। যে চুরি বন্ধের জন্য এই মিটার, সেই সব চোরকে তো সরকার বা বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা সঙ্গে নিয়ে বসে থাকেন।
লেখক সুখেন্দু সেন লিখেছেন, ‘যারা অল্পবিস্তর লেখাপড়া শিখেছিলাম। এখন দেখছি স্মার্ট আর ডিজিটিাল বাংলাদেশের পাল্লায় পড়ে রাতারাতি অশিক্ষিত অকেজো হয়ে গেলাম।’
দৈনিক ভোরের কাগজের বার্তা সম্পাদক ইখতিয়ার উদ্দিন লিখেছেন, ‘আনকোরা লোকজন দিয়ে এসব কাজ চালানো হচ্ছে। তাই এত বিড়ম্বনা। বড় বড় স্মার্ট স্যাররা একটু নজর দিলে আম জনতার হয়রানি কমবে।’
প্রিপেইড মিটারের এই যন্ত্রণা কবে দূর হবে– জানতে বুধবার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে যোগাযোগ করলে, বোর্ডের কনিষ্ঠ থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনেকেই বললেন, ডিজিটাল যুগে এমন অফলাইন মিটারে গ্রাহক এতটাই অতিষ্ঠ যে, তাদের প্রতিদিনই গালি শুনতে হয়। এমন যন্ত্রণা কোনোভাবেই সইবার নয় বলেও মন্তব্য করেন তারা।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সুনামগঞ্জে শুধু পিডিবিরই এ ধরনের মিটার আছে ২০ হাজার। বিদ্যুতের রেট বাড়ালে কিংবা নতুন কোনো চার্জ বা ফি দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেই রিচার্জ করার সময় ১৮০ থেকে ২২০ ডিজিটের টোকেন নম্বর টিপতে হয়।
ওই কর্মকর্তা জানান, ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পুরোনো মিটার পরিবর্তন করে প্রায় ২০ হাজার এমন গ্রাহককে প্রিপেইড মিটার দেওয়া হয়। চায়নার তৈরি এসব মিটার লাগানো একেবারেই ঠিক হয়নি। সবার প্রত্যাশা স্মার্ট মিটার। যেখানে সিম থাকবে। মেসেজ করলেই টাকা রিচার্জ হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মচারী জানান, ২০২২ সালের পর থেকে বাধ্যতামূলক প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার বা পিএলসি মিটার সুনামগঞ্জে লাগানো হলেও এগুলো সুনামগঞ্জে স্মার্ট মিটার হিসেবে কাজ করছে না। পাশের জেলা শহর সিলেটে এগুলো স্মার্ট মিটার হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু নুয়মান জানান, মেসেজ করলেই টাকা মিটারে রিচার্জ হয়, এমন মিটার ঢাকা-সিলেটসহ অনেক স্থানেই আছে। সুনামগঞ্জে সেটি হবে না। এটার জন্য আলাদা সার্ভার লাগে, যেটি এখানে নেই। আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে এটি করতে হবে। স্মার্ট মিটারকে পিডিবির সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ২০১৭ সালে অফলাইনের প্রায় ২০ হাজার মিটার এখানে লাগানো হয়েছে, এগুলো কখনোই স্মার্ট মিটার হবে না বলেও জানান এই প্রকৌশলী।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (সিলেট অঞ্চল) আব্দুল কাদির জানান, অফলাইনের মিটারের যন্ত্রণার কথা প্রতিদিনই শুনতে হয়। ১৮০-২২০ ডিজিট রিচার্জ করার কষ্টের কথা গ্রাহকরা জানান তাঁকে। এ বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতনদের ভাবা উচিত। গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।




















