‘বান্দের (বাঁধ) কাজের গতি কম। যেলাখান (যেভাবে) কাজ করের, মাঘ মাসেও কাজ শেষ অইতো নায়, গাঙে (নদী) পানির চাপ দিলে বাঁধভাঙ্গন একশত একশ।’
ক্ষোভ আর হতাশার সুর শোনা গেল তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের বড় কৃষক সফর উদ্দিনের কণ্ঠে। রোববার সমকাল প্রতিবেদকের সঙ্গে বাঁধের কাজের ব্যাপারে কথা বলার সময় এভাবেই নিজের শঙ্কার কথা জানান সফর উদ্দিন।
শনির হাওরের ফসল রক্ষা হলে তিন উপজেলার কৃষককের মুখে হাসি ফুটবে। এই হাওরের সাহাবনগর ও লালুর ঘোয়ালাতে এবার বিদেশি মডেলে (সাউথ কোরিয়া) দুটি বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, দেশি হাওরের বান ঠেকাতে বিদেশি পরিকল্পনা কতটা টেকসই, তা যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেননি সংশ্লিষ্টরা। তাদের যেমন ইচ্ছা করেন। উচিত কাজ ফেলে তারা অপ্রাসঙ্গিক জিনিস নিয়ে ব্যস্ত।
সেখানকার স্থানীয় কৃষকরা জানান, বাঁধের কাজ করছেন বাইরের ঠিকাদাররা, বিদেশি ডিজাইনে। তাদের কাজের ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে, হাওরাঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশেষ ধারণা না নিয়েই কাজে নেমেছে তারা। মাটি কেটে তুলছেন বাঁধের নিচ থেকে। বাঁধের ওপরের দিকের প্রশস্ততা কমে যাচ্ছে। বাঁধ কেবল উঁচু হচ্ছে; শক্ত হচ্ছে না। এভাবে কাজ করলে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়বে। বান এলে ভেঙে পড়বে তাসের ঘরের মতো।
তাহিরপুরের কৃষক ও রাজনীতিবিদ মোতাহের হোসেন আখঞ্জি শামীম জানান, লালুর ঘোয়ালা এবং সাহাবনগর থেকে বগিয়ানি স্লুইসগেট পর্যন্ত বাঁধের কাজের গতি একেবারে ধীর। এভাবে কাজ করলে পানি আসার আগে কাজ শেষ হবে না। কাজ শেষের আগে পানি এলে দুই-তিন উপজেলায় মাতম শুরু হবে কৃষকের।
স্থানীয় আমিনুল ইসলাম জানান, শনির হাওরের পূর্বে রক্তি নদী। উত্তর-পশ্চিমে বৌলাই নদী। সাহাবনগর এবং লালুর ঘোয়ালা বৌলাই নদী ঘেঁষে বড় আকারের বাঁধ। সীমান্তের মেঘালয় পাহাড়ে বৃষ্টি হলেই বৌলাই হয়ে পানি নামে। শনির হাওরের পাশ দিয়ে এই পানি ভাটিতে নিচু এলাকায় নামে। এই বাঁধ ভাঙলে শনির হাওর ডুবে যাবে। সেই সঙ্গে ডুববে শত শত কৃষকের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী গোলাম সারোয়ার লিটন জানান, শনির হাওরে ২৫ হাজার একর জমিতে বোরো আবাদ হয়। এর মধ্যে ১৬ হাজার একর জমি তাহিরপুর উপজেলার সীমানায়। হাওরের বাঁধের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জামালগঞ্জের রাধানগর এলাকার লালুর ঘোয়ালা। এর আগে ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৭ সালে এই বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে গেল বছর পর্যন্ত এই বাঁধে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এবার শুনেছি, এই বাঁধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে করা হয়।
বাঁধের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লালুর ঘোয়ালার মূল ভাঙনের পাশের বড় বড় ডোবা প্রতিবছর উঁচু বাঁধের মাটি পড়ে ভরাট হয়ে এসেছে। তবে এই ভাঙনের পাশেই জামালগঞ্জের সীমানার রাজধরপুরের বিপরীত অংশে আরেকটি নতুন ভাঙন দেখা দিয়েছে। ওটাকেও স্থানীয় কৃষকরা লালুর ঘোয়ালা বলে থাকে। সেখানে এখনও কাজ শুরু হয়েছে কিনা; নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান,
শনির হাওরের লালুর ঘোয়ালা ও সাহাবনগর এলাকায় রাজধানীর কাকরাইলের হাঞ্জিল ও এমসি নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করছে। সাউথ কোরিয়ার প্রকৌশলীদের পরিকল্পনায় তাদের দেশের বাঁধের মডেলে দুটি প্রকল্পে প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ হচ্ছে। বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। বাঁধের গোড়া কাটার বিষয়ে তিনি জানালেন, কোরিয়ান প্যাটার্নই এ রকম। পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজ হচ্ছে। দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
তবে কর্তৃপক্ষ যা-ই বলুক, স্থানীয় সচেতন গোষ্ঠী বলছে, কৃষকের জীবন-মরণ ইস্যু কী করে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে– তাদের মাথায় আসে না। এখানকার প্রকৃতি আর প্রতিবেশ কি কোরিয়ার মতো? বাঁধের গোড়া কেটে ওপরে উঁচু করলে বাঁধ নড়বড়ে হয়ে যাবে– সেটা হাওরাঞ্চলের শিশুরাও বোঝে। বিদেশি জিনিস মানেই ভালো– এই সংকীর্ণ মানসিকতা ধারণের দিন এখন নেই। দেশের সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনাও উন্নত হয়েছে।




















