টাঙ্গুয়ার হাওরে নজিরবিহীনভাবে কমেছে অতিথি পাখির আগমন

  • প্রকাশের সময় : ১০/০২/২০২৪ ০৩:৩৬:৫৮ AM

ছবি- সংগৃহীত

Share
43

দেশের বৃহত্তম জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরে এবার অতিথি পাখির আগমন নজিরবিহীন কমে গেছে। শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে সূদূর সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একসময় বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওরে কয়েক লাখ পরিযায়ী পাখি আসত। এখন সেই অবস্থা আর নেই। প্রতিবছরই কমছে পাখির আগমন। এবার ৩০ হাজারের মতো এসেছে বলে জানিয়েছেন হাওরপাড়ের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই শিকারিদের নিধনযজ্ঞ ও খাদ্যের অভাবে এগুলো টাঙ্গুয়াবিমুখ হয়েছে।


সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের টাঙ্গুয়ার হাওর ধর্মপাশা ও তাহিরপুরের চারটি ইউনিয়নের ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। ছোট-বড় মিলিয়ে ওখানে বিল আছে ১০৯টি। প্রধান বিল ৫৪টি।


স্থানীয়রা বলে থাকেন, ‘হাওরে ছয় কুড়ি বিল, নয় কুড়ি কান্দা রয়েছে।’ এর মধ্যে বেরবেরিয়া, তেকোনিয়া, হাতিরগাদা, মইষেরগাদা, লেচুয়ামারা, রৌয়া, রূপা বৈয়ে শীতের মৌসুমে এক সময় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে অবস্থান নিত।


আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) ২০১১ সালের এক জরিপে টাঙ্গুয়ার হাওরে ৬৪ হাজার পাখির বিচরণ দেখতে পেয়েছে। এতে ৮৬ জাতের দেশি এবং ৮৩ জাতের বিদেশি পাখির কথা উল্লেখ করা হয়।


পাখি দেখা ও রক্ষণাবেক্ষণে উৎসাহীদের সংঘ বার্ডস ক্লাবের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে স্থানীয় উন্নয়নকর্মী সাজেদা আহমেদ বললেন, গত কয়েক বছরে হাওরে পাখির সংখ্যা কমেছে ৮৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে প্রায় দুই লাখ পাখি এখানে এসেছিল, কিন্তু ২০২২ সালে তা কমে গিয়ে ৩০ হাজারে দাঁড়ায়। ২০০২ সাল পর্যন্ত এখানে পাঁচ লাখ পাখি আসার রেকর্ডও রয়েছে বলে জানান তিনি।

হাওরপাড়ের ভবানীপুর গ্রামের সমীরণ তালুকদার বলেন, সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, হিমালয়, উত্তর এশিয়া, নেপালসহ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অতিথি পাখি এ হাওরে আসত। এর মধ্যে লেঞ্জা, পাতিহাঁস, বুটিহাঁস, বৈকাল, নীলশির, পানকৌড়ি, পাতারি, দলপিপি, রাঙ্গামুড়ি, পান্তামুখী পাখি মার্চের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এখানে থাকত। এগুলোর ঝাঁক হাওরপাড়ের গ্রামের ওপর দিয়ে গেলে মনে হতো ঝড় আসছে। পাখা-ঝাপটানোর শব্দে ঘুম ভেঙে যেত। এখন সে অবস্থা আর নেই।


তিনি আরও বলেন, পাখিরা এখন এই এলাকাকে অনিরাপদ মনে করছে। দু-তিন বছর আগে পর্যন্ত ফাঁদ পেতে পাখি মারা হতো। এখন সেই অত্যাচারের মাত্রা আরও নির্মম হয়েছে। গভীর রাতে হাই ভোল্টেজের টর্চ লাইট নিয়ে নামছে শত শত নৌকা। তারা পাখির দল লক্ষ্য করে কাছাকাছি গিয়ে হাই ভোল্টেজের টর্চ লাইট জ্বালায়। পাখিরা তখন দিশেহারা হয়ে লাইটের দিকে আসতে থাকে। পরে কোচ (বিশেষ যন্ত্র) দিয়ে তাদের মারে শিকারিরা। এভাবে শিকারের সময় যেসব পাখি আহত হয়ে ফিরে যায়, তারা সমগোত্রীয়দের বিপদের এই বার্তা তাদের মতো করে জানিয়ে দেয়। এ কারণে পাখিরা এই হাওরকে এখন ভয় পায়।


জানা গেছে, শিকার করা এসব পাখি রাতেই মোহনগঞ্জ হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়।


টাঙ্গুয়ারপাড়ের জয়পুরের গণমাধ্যমকর্মী আহমদ কবির বলেন, খাবারের সঙ্গে অর্থাৎ শামুখ-ঝিনুকের সঙ্গে বিষ মিশিয়েও পাখি মারা হচ্ছে। সন্ধ্যার পর পর বিষ মিশিয়ে অভয়াশ্রমে ছিটানো হয়। রাতে পাখি এসে বিলে নেমে বিষ মেশানো খাবার খেয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শেষ রাতে শিকারিরা তাড়া করে সেগুলোকে। নিস্তেজ পাখিরা ওইসময় উড়াল দিতে পারে না। শিকারিরা এদের ধরে নিয়ে যায়। কয়েকদিন আগে হাওরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজনই এক শিকারিকে তিন-চারটি পাখিসহ আটক করে এক পর্যায়ে ছেড়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি।


হাওরপাড়ের স্কুল শিক্ষক হাদিউজ্জামান বলেন, এ জলাভূমিতে পাখির খাদ্যেরও অভাব দেখা দিয়েছে। ঝাউ-পাতুরি, ছোট মাছ, শামুক-ঝিনুক কিছুই এখন পানির নিচে নেই। চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে এসব কিছুর সর্বনাশ ঘটানো হয়েছে গত কয়েক বছরে। হাওরকে দিনের বেলা কিছুটা শাসনের মধ্যে রাখলেও রাতে নামে শত শত জেলে ও পাখি শিকারির নৌকা। এদের অত্যাচারের ভয়ে এই জলমহাল ছেড়েছে অতিথি পাখিরা।


হাওরপাড়ের এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের আশপাশের জলমহালের ইজারাদারও পাখি মারতে শিকারিদের উৎসাহিত করে। তাদের জলমহালের খলাঘরেও শিকারিরা রাত্রি যাপন করে বলে অনেকেই জানিয়েছেন।



জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করব। টাঙ্গুয়ার হাওরে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠানো হবে। সংশ্লিষ্টদের নিবিড়ভাবে হাওর তদারক করার নির্দেশ দেওয়া হবে।’



সিলেট প্রেস / ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪/ এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৪-০২-১০ ০৩:৩৬:৫৮