বাসস্টেশন এখন গলার কাঁটা

  • প্রকাশের সময় : ০৫/০২/২০২৪ ০২:০৫:৫৩ AM

নতুন বাসস্ট্যান্ডের বেহাল অবস্থা। ভোগান্তির কারণে সেখানে যেতে চান না পরিবহন শ্রমিকরা

Share
95

সুনামগঞ্জের নতুন বাসস্টেশনে প্রবেশ পথের কয়েক গজ যেতেই দেখা গেল, চার তরুণ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করছে। একটু এগোতেই প্রস্রাবের ঝাঁজ নাকে আসছিল। এই পথ দিয়ে ভেতরে যেতে যেতে কয়েকজন শ্রমিক বলছিলেন, ‘যত ভিতরে (ভেতরে) যাইবা (যাবেন) দুর্গন্ধ আরও বেশি পাইবা (পাবেন)। যাত্রী ছাউনিতে অখন (এখন) রাইতের (রাতের) বেলা, কোনো কোনো সময় দিনেই টয়লেট (পায়খানা) করইন (করেন) শ্রমিকরা।’ সুনামগঞ্জ শহরের নতুন বাসস্টেশনের চিত্র এটি। জেলা সদরের এই বাসস্টেশন এখন সুনামগঞ্জবাসীর গলার কাঁটা। 

ছয় একর জমির ওপর ১৯৯৪ সালে গড়ে উঠেছিল সুনামগঞ্জের নতুন বাসস্টেশন। এই স্টেশনের ডান দিকের একাংশে বড় পুকুর এবং পুকুরের বাঁয়ে-ডানে প্রবেশ সড়ক করে ভেতরে করা হয়েছে টার্মিনাল। সেখানে একটি যাত্রী ছাউনি ও অফিস ঘরও হয়েছিল। এখন এগুলো ডাস্টবিনের মতো ব্যবহার করছে শ্রমিকরা। রাতে টার্মিনালে বাস ঢুকিয়ে রাখা দূরের কথা, দিনেও কেউ প্রবেশ করে না এই টার্মিনালে। 



জানা গেছে, ৪০০ বাসের মধ্যে ৫০-৬০টির স্থান সংকুলান হয় নতুন বাসস্টেশনে। অন্য বাসগুলো সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে পার্কিং করা হয়। এ কারণে সুনামগঞ্জ শহরে প্রবেশের একমুখী সড়কে যানজট থাকে দিনের পুরোটাজুড়েই। আর বিকেলে পুরাতন বাসস্টেশন এলাকায় চলাফেরা করলে দুর্ভোগে পড়তে হয়। জনবসতিপূর্ণ এই এলাকার সড়কেই যাত্রী ওঠানামা করায় বাসগুলো।



সুনামগঞ্জ জেলা বাস-মিনিবাস-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. আব্দুল মতিন বলেন, দেশের কোনো জেলা সদরের বাসস্টেশনের এত খারাপ অবস্থা আছে বলে জানা নেই আমার। স্টেশন করার সময় একটি অফিস রুম করা হয়েছিল। এটির দরজা-জানালা ভাঙাচোরা, বসার উপযোগী পরিবেশ নেই। বাথরুমও ব্যবহার অনুপযোগী। আগে স্ট্যান্ডে একটি পুকুর ছিল, বাসগুলো ধোয়ার জন্য পানি পাওয়া যেত, এখন সেটিও নেই। পুকুর ভরাট হয়েছে স্ট্যান্ড সম্প্রসারণ করার জন্য, ওই অংশও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আরও কমপক্ষে দুই ফুট ভরাট না হলে এবং পাকাকরণ না হলে সেখানে বাস রাখা সম্ভব নয়।

শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য আব্দুল মালেক বলেন, ড্রাইভাররা যাত্রীবাহী গাড়ি নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে এলে পথে যাত্রী নামিয়ে দিতে হয়। এতে শহরে যানজট তৈরি হয়। এ নিয়ে প্রায়ই পুলিশের সঙ্গে গাড়িচালকদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।



বাসচালক সেলিম আহমদ বললেন, নতুন বাসস্ট্যান্ডে বৃষ্টির দিনে যাত্রীরা কাউন্টারে এসে দাঁড়ানোর মতো পরিবেশ নেই। একটি বাথরুমও নেই। আন্তঃজেলা বাসের শ্রমিকরা বাসেই বিশ্রাম নেয়। এখন দেশের সব অঞ্চলে টার্মিনালে বিশ্রামাগার হয়েছে। এখানে সেটি হয়নি।



বাসচালক শফিক মিয়া বলেন, দিনের বেলা দূরপাল্লার বাস নিয়ে সুনামগঞ্জে পৌঁছালে যাত্রী নামানোর সময় যন্ত্রণা পোহাতে হয়। এখানকার দোকানিরা বলেন, দোকানের সামনে বাস রাখা যাবে না। আবার পুলিশ বলে সড়কে বাস রাখা যাবে না। টার্মিনালেও বাস ঢোকানোর উপায় নেই। একইভাবে এখানে ট্রাকস্ট্যান্ড নেই। ট্রাকচালকরাও সড়কে গাড়ি রাখেন। এ কারণে সড়কে জট তৈরি হয়। 

পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক অনুকূল দেব বলেন, বাসস্টেশনের উন্নয়নের জন্য তারা নানা জায়গায় ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু কেউ তাদের দাবি-দাওয়াগুলো আমলে নিচ্ছেন না।




আলাপকালে বাসস্টেশনের কয়েকজন শ্রমিক জানান, কারণে-অকারণে চাঁদাবাজি আছে বাসস্টেশনে। কিন্তু শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ কমই হয়। স্টেশনে এক সময় বিশুদ্ধ পানির জন্য তিনটি টিউবওয়েল ছিল। এখন তিনটিই নষ্ট, পানি ওঠে না।

সুনামগঞ্জ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল মিয়ার ভাষ্য, প্রতিদিন ৪০০ বাস জেলা শহরে অবস্থান করে। এ কারণে পুরাতন বাসস্টেশনে সব সময় যানজট থাকে। এটি দূর করতে হলে বাসস্টেশনের আধুনিকায়ন জরুরি। 

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ্‌ বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যোগাযোগের জন্য সুনামগঞ্জ জেলা শহরের একটি মাত্র সড়ক। এই সড়কটিকে যানজটমুক্ত রাখতে পুলিশ চেষ্টা করছে। এ জন্য পুরাতন বাসস্টেশন থেকে সব যানবাহন সরিয়ে নেওয়া জরুরি।



বাসস্টেশনের ইজারা কর্তৃপক্ষ জেলা পরিষদ। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল হুদা মুকুট জানান, নতুন বাসস্টেশনটি বড় ও আধুনিক করা না গেলে সড়ক থেকে এবং পুরাতন স্টেশন থেকে বাস সরানো যাচ্ছে না। জনসাধারণের দুর্ভোগও কমছে না। 



সিলেট প্রেস / ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪/ এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৪-০২-০৫ ০২:০৫:৫৩