সম্প্রতি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় থাকা রেলওয়ের অরক্ষিত সম্পদ চুরির প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে বেহাত হয়ে যাচ্ছে রেলওয়ের এসব সম্পদ।
বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভাগের আওতাধীন ছাতক অঞ্চলের কোটি কোটি টাকার সম্পদ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে অনেক দিন ধরে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসব সম্পদের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যার কারণে ছাতক বাজার এলাকা থেকে রেলওয়ের মালপত্র নিয়মিত চুরি হচ্ছে। তারপরেও বাড়ানো হচ্ছে না নজরদারি।
চোরচক্র কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২০ সালের ২৯ জুনের ঘটনায়। সেই রাতে রেলওয়ের একটি গুদামে চুরির সময় সেখানে দায়িত্বে থাকা ফখরুল আলম নামে এক নিরাপত্তাকর্মীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপরেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া হয়নি। সরকারি সম্পদ রক্ষায় এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়নি।
রেলপথে ছাতক বাজার স্টেশন থেকে সিলেট পর্যন্ত দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। করোনা মহামারির সময় থেকে ছাতক-সিলেট রেলপথে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালের ভয়াবহ বন্যায় এ রেলপথ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্রোতের টানে রেললাইনের স্লিপারের নিচের পাথর সরে যায়। সংস্কারের অভাবে এখনও এ পথে রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। তখন থেকেই অরক্ষিত হয়ে পড়ে রয়েছে এখানকার রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ। সুযোগ পেয়ে এসব সম্পদ চুরির মহোৎসব চলছে।
জানা গেছে, ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় ছাতক-সিলেট রেলপথের ৪টি রেলওয়ে স্টেশনের সবই বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও রেলওয়ের আওতাধীন ছাতক-ভোলাগঞ্জ রজ্জুপথ, রেলওয়ের পাথরকোয়ারি, দেশের একমাত্র সরকারি কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট, রেলওয়ের কয়েকটি গুদাম, শতাধিক সরকারি কোয়ার্টার, বিভিন্ন দপ্তর, হাসপাতাল, ভোলাগঞ্জ রেস্ট হাউস, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনাসহ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ভূসম্পদ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় প্রায় রাতেই চুরি হচ্ছে রেল বিভাগের এসব সম্পদ। প্রায় সময়ই রেললাইনের স্লিপার, নাটবল্টু, গাড়ির চাকা ও কাঠ চুরির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
গত কয়েক মাসে ছাতক রেলওয়ে হাসপাতালের দরজা-জানালা, সামনের গেটসহ ভেতরের সব মালপত্র চুরি হয়ে গেছে। তালাবদ্ধ হাসপাতালটির শুধু নামফলকই রয়ে গেছে। হাসপাতালের
ভবনের শুধু চারটি দেয়াল আর ছাদ ছাড়া বাকি সবই চুরি গেছে। রেল গুদামের মালপত্র, নদীর ঘাটের পাথর ও স্ক্র্যাপ মালও চুরির খবর পাওয়া গেছে। এসব চুরির ঘটনায় ছাতক বাজার রেলওয়ে শাখা কর্তৃপক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেই দায়িত্ব সারছে।
জানা গেছে, বর্তমানে রেলওয়ের কয়েকটি শাখার জন্য ২০ জন স্থায়ী প্রহরীর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪ জন। ১৬টি নিরাপত্তা প্রহরীর পদ শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে। রেলওয়ের সম্পদ পাহারায় যে সব টিএলআর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তা শুধু কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। গত ডিসেম্বর মাসে ১২ জন টিএলআর নিয়োগ দেওয়া হলেও এসব নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক লোকজন জানান, স্টেশনসহ রেলপথ ও রেলওয়ের বিভিন্ন শাখার সম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রহরী নেই। যে কারণে এখানে মালপত্র চুরি দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় একটি চক্র রেলওয়ের মালপত্র চুরির পর ছাতক ও সিলেটের বিভিন্ন লোহার ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। সম্প্রতি রেলগাড়ির চাকা, লোহাসহ আরও কিছু মালপত্র পিকআপ ভ্যানে করে নিয়ে পালানোর সময় রজত দাস নামে একজনকে আটক করা হয়। সে ছাতক পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা।
ছাতক রেলওয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (কার্য ছাতক বাজার) জাকির হোসেন জানান, ৬ মাসের মধ্যে রেলওয়ে এলাকায় কোনো চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে তাদের জানা নেই। তবে চুরি ঠেকাতে লোকজন দায়িত্ব পালন করছে।
তবে রেলওয়ে বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত) সিরাজ জিন্নাহ নিরাপত্তার দুর্বলতার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, রেলওয়ের সরকারি সম্পদ রক্ষার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।




















