প্রকৃতির সঙ্গে কখনও সমঝোতা, আবার কখনও তার বৈরিতার বিরুদ্ধে প্রবল সংগ্রাম। অভাব, দারিদ্র্য আর নানামুখী সংকটের মাঝেও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দেশের শস্যভান্ডারে জোগান দিতে লড়তে হয় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের। সেই ফসল চাষাবাদের কাজে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকলে ভোগান্তি পৌঁছায় চরমে।
গত বছরের মতো এবারও সুনামগঞ্জের ছাতক, তাহিরপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ নিয়ে শুরু হয়েছে টালবাহানা। অতীতের নানা অভিযোগ আর সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে এমনিতেই এবার প্রকল্পের কমিটি থেকে নিজেদে গুটিয়ে নিচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা। এতে সদস্য সংগ্রহে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তার মধ্যেই জানা গেছে শুরু থেকেই বাঁধের কাজের বিভিন্ন পর্যায়ের অনিয়মের কথা।
ছাতক ও তাহিরপুরের হাওরাঞ্চলের প্রকল্পের কাজে এরইমধ্যে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বাঁধের কাজের জন্য নির্ধারিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন ও কাজ শুরুতে ধীরগতির কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সেখানকার প্রান্তিক কৃষকরা। ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝেও। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শেষ করা ও ফসলের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত তারা। প্রতি বোরো মৌসুমে হাওরের উচ্চ ও নিম্নাঞ্চলের পরিবেশগত বৈচিত্র্যের কারণে সেখানকার বোরো চাষ ও ফসল উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে হাওরাঞ্চলের এসব ফসল রক্ষা বাঁধ।
ছাতকের হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধে কাজ করার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে নানা অনিয়ম ও ধীরগতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রক্রিয়া শুরু করে বাঁধের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় পিআইসি গঠন সম্পন্ন হয়নি এক মাসও। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাওরপাড়ের স্থানীয় কৃষকরা।
বুধবার বাঁধ নির্মাণের কাজে কচ্ছপগতির কারণে ক্ষুব্ধ কৃষকরা উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। হাওর বাঁচাও আন্দোলন, ছাতক উপজেলা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব পিআইসি গঠন করে বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া বাঁধের কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন সংগঠনের নেতা ও স্থানীয় কৃষকরা।
সংগঠনের জেলা কার্যকরী সভাপতি ও ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল তাঁর বক্তব্যে সধারণ কৃষক ও সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব কথা বলেন।
সংগঠনের উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক শাহ্ মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে ও বাঁধবিষয়ক সম্পাদক দিলোয়ার হোসেনের পরিচালনায় মানববন্ধন চলাকালে বক্তারা বলেন, ১৫ ডিসেম্বর থেকে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরুর কথা থাকলেও উপজেলার ৩২টি পিআইসির মধ্যে এখন ২৩টি গঠন করে বাঁধের কাজ শুরু করা হয়েছে। এখনও ৯টি বাঁধের কাজ শুরু করা হয়নি।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পিআইসি মনিটরিং কমিটির সভাপতি গোলাম মোস্তফা মুন্না বলেন, মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে পিএসসি কমিটি গঠনে বিলম্ব হয়েছে। ৩২টি পিআইসির মধ্যে ২৩টির কাজ চলমান। আগামীকাল আরও ৮টির কাজ শুরু হবে এবং পরদিন আরও একটি কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করছি।
এদিকে একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে জেলার তাহিরপুর উপজেলার হাওরাঞ্চলে। সেখানে রক্ষা বাঁধের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় ক্ষোভ জানান ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ তাহিরপুর উপজেলা শাখার নেতারা। এ সময় স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ গ্রামবাসী উপস্থিত ছিলেন।
সংগঠনের নেতারা এ সময় বাঁধের কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কৃষকদের স্বার্থে সে সব প্রতিহতের কথা জানান।
বুধবার উপজেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে উপস্থিত সংগঠনের সদস্য ও সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী উপজেলা জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশায় ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হয়ে এরইমধ্যে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। অথচ তাহিরপুর উপজেলার ৮২টি প্রকল্পের কার্যাদেশই এখনও দেওয়া হয়নি। প্রায় ৯০ ভাগ প্রকল্পের স্থানে এখন পর্যন্ত মাটিও ফেলা হয়নি। তারা দ্রুত বাঁধের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখের মধ্যে বাঁধ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার দাবি জানান।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন বলেন, ৮২টি প্রকল্পের কয়েকটির ৫০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ শুরু হয়েছে।




















