প্রেমিকের মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন অথৈ

  • প্রকাশের সময় : ২৫/০৭/২০২৬ ০৬:৫৬:৫৬ PM

Share
6

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার অথৈর আত্মহত্যার ঘটনায় তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, প্রেমিক ইয়াছিন মজুমদারের ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতন, অপমানজনক আচরণ ও প্ররোচনামূলক কর্মকাণ্ড সহ্য করতে না পেরে অথৈ আত্মহত্যা করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন গত ১৯ মে ইয়াছিনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। গত ১৪ জুলাই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য বদলির আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সোহানুর রহমান।

গত বছরের ২৯ এপ্রিল সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের নন্দলাল লেনের একটি মেসে আত্মহত্যা করেন অথৈ। পরদিন তার বাবা প্রণব মজুমদার মেয়েকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে সূত্রাপুর থানায় মামলা করেন। মামলায় প্রেমিক ইয়াছিন মজুমদারকে আসামি করা হয়। ওই দিনই ইয়াছিনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে আদালতে হাজির না হওয়ায় চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তার জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।


এদিকে, ইয়াছিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন বাদী ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।


যোগাযোগ করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছি। ভিকটিম কী কারণে আত্মহত্যা করেছে, তার মনের কথা জানা সম্ভব নয়। তবে তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

স্ত্রীকে নিয়ে চট্টগ্রামে বসবাস করেন অথৈর বাবা প্রণব মজুমদার। তিনি বলেন, মেয়েকে হারানোর পর আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি। অসুস্থ হয়ে গেছি। সন্তান হারানোর বেদনা কেবল একজন বাবা-মাই বুঝতে পারেন।

তিনি জানান, দুই মেয়ের মধ্যে অথৈ ছিল ছোট। বড় মেয়ে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়ন করছেন। অথৈকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল।

তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তাকে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। আমার মেয়েকে পৃথিবী ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।


বাদীপক্ষের আইনজীবী সুমন কুমার রায় বলেন, অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে, আসামির মানসিক নির্যাতনের কারণেই ভিকটিম আত্মহত্যা করেন। আসামির মোবাইলে তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ছবি ছিল। সেই ছবি দেখিয়ে তিনি ভিকটিমকে ভয় দেখাতেন এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় ছবিটি পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রথম থেকেই আসামি এ ধরনের কোনো ছবি থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছিল। পরে ফরেনসিক প্রতিবেদনে ছবির বিষয়টি উঠে আসার পর তিনি স্ট্রোক করেন। পরে তার মৃত্যুর খবরও আমরা জেনেছি।

তবে এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, নিহতের বাবা-মায়ের চাওয়া ছিল প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসুক এ আত্মহত্যার কারণ কি। প্রমাণ হলো, আসামির মানসিক টর্চারে সে আত্মহত্যা করেছে। তদন্তে নগ্ন ছবির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, ছেলেটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ ছিল। কয়েক দিন আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে তার পরিবার জানিয়েছে। বিষয়টি আদালতকেও জানানো হবে।


নগ্ন ছবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি একাধিকবার তাকে জিজ্ঞাসা করেছি। সে জানিয়েছে, তার কাছে এ ধরনের কোনো ছবি ছিল না। বাদীপক্ষের আইনজীবীর দাবি সঠিক নয়।"


অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার একই এলাকায় পাশাপাশি বাড়িতে থাকতেন অথৈ ও ইয়াছিন। তারা একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। সেখান থেকেই তাদের পরিচয়। পরিচয়ের পর ইয়াছিন বিভিন্ন সময় অথৈকে প্রেমের প্রস্তাব দেন।

এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে ভর্তি হন অথৈ। পড়াশোনার জন্য তিনি সূত্রাপুরে একটি মেসে থাকতেন। অথৈ ঢাকায় আসার পর ইয়াছিনও ঢাকায় এসে লালবাগের ‘জমিদারী ভোজ’ নামে রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের চাকরি নেন। এরপরও তিনি বিভিন্নভাবে অথৈকে অনুসরণ ও বিরক্ত করতে থাকেন।


একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, সম্পর্কের পরও ইয়াছিন প্রায়ই অপমানজনক কথা বলতেন, মিথ্যা অপবাদ দিতেন এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন।


ঘটনার দিন (২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল) সংগীত উৎসবের মহড়া শেষে মেসে ফেরার সময় গেটের সামনে ইয়াছিনের সঙ্গে অথৈর দেখা হয়। সে সময় ইয়াছিন তাকে সংগীত উৎসবে অংশ না নিতে চাপ দেন, গালাগাল করেন এবং অপমানজনক কথা বলে মানসিকভাবে হেনস্তা করেন।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে যেকোনো সময় মেসের কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন অথৈ।


অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার সময় মোবাইল ফোনে কথোপকথনের একপর্যায়ে ইয়াছিন বুঝতে পারেন যে অথৈ আত্মহত্যার চেষ্টা করছেন। পরে বাড়ির মালিক ও স্থানীয়দের নিয়ে কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে অথৈকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ইয়াছিনের ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতন, অপমানজনক আচরণ এবং প্ররোচনামূলক কর্মকাণ্ডের ফলেই অথৈ আত্মহত্যা করেছেন।


সিলেট প্রেস / নিউজ ডেস্ক


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৭-২৫ ১৮:৫৬:৫৬