জাল পাতা হলেও অধরা চোরাচালানের গডফাদার সেলিম!

  • প্রকাশের সময় : ২০/০৬/২০২৬ ১১:১৪:০১ PM

Share
15

সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর উপজেলা। পাহাড়, হাওর আর ঐতিহাসিক জৈন্তা রাজবাড়ির সৌন্দর্যে ঘেরা এই শান্ত জনপদটি এখন গভীর উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। গত চার মাস ধরে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাবের ব্যাপক তৎপরতায় একের পর এক জব্দ হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য, দামি স্মার্টফোন, কসমেটিকস এবং অভিনব কায়দায় লুকিয়ে রাখা মরণ নেশা মাদক। তবে একের পর এক চালান ধরা পড়লেও সীমান্তবাসীর কপালে চিন্তার ভাঁজ কমছে না।

কারণ, এই চোরাচালান ও মাদক বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছে এক শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যার মূল হোতা স্থানীয়ভাবে ‘ব্রয়লার সেলিম’ নামে পরিচিত সেলিম আহমেদ। সাম্প্রতিক সময়ে ফতেহপুর ইউনিয়নের হরিপুর বালীপাড়া এলাকার একটি গোডাউন থেকে ১৬ লক্ষ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের ৭৫ বস্তা ভারতীয় জিরার বিশাল চালান জব্দের পর এই সিন্ডিকেটের পুরো নেটওয়ার্কের গা শিউরে ওঠা তথ্য বেরিয়ে এসেছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্ত এলাকার এই বিশাল চোরাচালান চক্রটি এক রাতে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক দীর্ঘ ইতিহাস। নিজেকে স্থানীয় যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছে সেলিম আহমেদ।তবে এই সেলিমের সাথে যুবদলের কোন সম্পর্ক নেই বলে জানান অনেক নেতা। তার নেই কোন পদপদবী।


স্থানীয় সচেতন মহলের স্পষ্ট অভিযোগ, এই রাজনৈতিক তকমা মূলত সীমান্তে অবাধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর একটি শক্তিশালী আইনি ঢাল। ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনীতির সমীকরণ যাই হোক না কেন, সেলিম সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় উপ-গ্রুপগুলোর সাথে এক অদৃশ্য সুসম্পর্ক বজায় রাখে, যা তার চোরাচালানের রুটগুলোকে বছরের পর বছর সচল রাখতে সহায়তা করে আসছে।ব্রয়লার সেলিম’ নামটির উৎপত্তি মূলত ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে ব্রয়লার মুরগি ও চুনো মাছের পোনা আমদানির মাধ্যমে হলেও, বর্তমানে তার সাম্রাজ্য টেক্সটাইল থেকে শুরু করে মরণনেশা মাদক পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

এই নেটওয়ার্কটি অত্যন্ত সুসংগঠিত চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেলিম আহমেদ নিজে কখনোই সীমান্ত স্পটে গিয়ে মালামাল বহন করে না। তার রয়েছে একঝাঁক বিশ্বস্ত সহযোগী, যারা ভিন্ন ভিন্ন জোনের দায়িত্ব পালন করেন। আমির (মিনি স্টেডিয়াম আস্তানা): সেলিমের এই সেকেন্ড-ইন-কমান্ড জৈন্তাপুর মিনি স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলায় সরকারি কোনো অনুমতি ছাড়াই অবৈধ ভাবে আস্তানা গেড়ে বসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেলিমের সরাসরি নির্দেশে সে পুরো স্টেডিয়াম এলাকাকে মাদক বিক্রির নিরাপদ জোনে পরিণত করেছে এবং স্থানীয় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন ও নিষিদ্ধ ট্যাবলেট ইয়াবা, হেরাইন, মদের খুচরা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে।


জেবু (শীর্ষ মাদক সরবরাহকারী): সেলিমের সরাসরি অর্থায়নে ভারত থেকে আসা ইয়াবা, ফেন্সিডিল এবং ভয়ঙ্কর মাদক আইস (ক্রিস্টাল মেথ) সিলেটের বিভিন্ন পয়েন্টে সরবরাহ করার মূল দায়িত্ব এই জেবুর কাঁধে। আলী গং (জালাল বস্তির পাহারাদার): জালাল বস্তি এলাকার এই অপরাধী চক্রটি সেলিমের মাদকের গোডাউন পাহারা দেওয়া, লাইনম্যান হিসেবে কাজ করা এবং প্রশাসনের গতিবিধির ওপর নজর রাখার দায়িত্ব পালন করে।


ভৌগোলিক সুবিধা ও দুর্গম রুটসমূহ: ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি, খাসিয়া পুঞ্জি এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের ওপারে থাকা ভারতীয় খাসিয়া চোরাকারবারিদের সাথে সেলিমের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ওপার থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেলেই মূলত জিরার মতো বড় বড় চালান বাংলাদেশে পুশ করা হয়। চোরাকারবারিরা যাতায়াতের জন্য জৈন্তাপুরের ডিবির হাওর, ফুলবাড়ী, টিপরাখলা সংলগ্ন পাহাড়ি ছড়া এবং সীমান্ত নদীগুলোকে প্রধান ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। বর্ষাকালে দুর্গম হাওর এলাকায় নৌকা দিয়ে এবং শীতকালে পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে পণ্য আনা হয়।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক

সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-২০ ২৩:১৪:০১