সিলেটে ১৫ বছরে বিলীন ৪৬০ পাহাড়-টিলা!

  • প্রকাশের সময় : ০৮/০৬/২০২৬ ০৬:১০:৪১ AM

Share
18

সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভূ-প্রকৃতি এবং ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হচ্ছে এর সবুজ পাহাড় ও টিলা। তবে গত দেড় দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন প্রকল্প এবং অবৈধভাবে মাটি ও বালু খেকোদের আগ্রাসনে সিলেটের মানচিত্র থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার কারণে অবর্ণনীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পুরো জেলার পরিবেশ।

​পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে সিলেট জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১,০২৫টি পাহাড় ও টিলার অস্তিত্ব রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি নজরদারির অভাব এবং প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেটের কারণে ২০২৪ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ৫৬৫টিতে এসে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে সিলেট থেকে প্রায় ৪৬০টি পাহাড় ও টিলা সম্পূর্ণ বা আংশিক কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে।

​২০২৫ ও ২০২৬ সাল জুড়ে অব্যাহতভাবে পাহাড় কাটার কারণে বর্তমানে পুরো জেলায় প্রকৃত পাহাড়-টিলার সংখ্যা ৫০০-এর নিচে নেমে এসেছে।

পুরো জেলার সুনির্দিষ্ট হালনাগাদ সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও, ২০২৫ সালের কিছু আঞ্চলিক প্রতিবেদনে সিলেট জেলার নির্দিষ্ট কিছু এলাকার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সিলেট শাখার সদস্য সচিব আবদুল করিম চৌধুরী কিম দাবি করেন গত তিন দশকে সিলেট নগরে প্রায় ৭০ শতাংশ টিলা ও পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। আর জেলায় ৬০ শতাংশ পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে।

​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাহাড়খেকো চক্র মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কৌশলে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। ​রাতের আঁধারে স্কেভেটর দিয়ে কাটা হয় পাহাড়। দিনের বেলা প্রশাসন ও পরিবেশবাদীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আধারে বড় বড় স্কেভেটর ও ট্রাক দিয়ে টিলার মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

​বিপন্ন পরিবেশের কারণে ঘন ঘন বন্যা ও ভূমিধসের শঙ্কা বেড়েছে। এছাড়া মানুষ ঝুঁকি নিয়ে টিলা ও পাহাড়ের নীচে বসবাস করছেন। প্রতিবছরই ভূমিধসের ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘পাহাড় ও টিলাগুলো সিলেটের ভূপ্রকৃতিতে ‘প্রাকৃতিক স্পঞ্জ’ হিসেবে কাজ করে, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধরে রাখে। কিন্তু এই টিলাগুলো বিলীন হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি সরাসরি সমতলে চলে আসছে। ফলে সিলেটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। একই সাথে পাহাড় কাটার কারণে প্রতি বছর বর্ষাকালে টিলা ধসে প্রাণহানির ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।’

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট নগরীর হাওলাদারপাড়া, আখালিয়া, পীরমহল্লা ব্রাহ্মণশাসন জাহাঙ্গীরনগর, তারাপুর চা বাগান এবং বালুচর, বিমানবন্দর সড়ক, খাদিমপাড়া, খাদিমনগর, জোনাকী, ইসলামপুর মেজরটিলা ও মোগলিপাড়া এলাকার বিভিন্ন পাহাড়-টিলার পাদদেশে কয়েক শত পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। এছাড়া জৈন্তাপুর, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাহাড় ও টিলার পাদদেশে হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে।

​সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩৮৬টি পরিবার এখনো পাহাড়ির পাদদেশে ডেথ পিট বা মৃত্যুর ফাঁদে বসবাস করছে। আর এই কারণেই প্রতি বছর দুর্ঘটনা ঘটে। আর যখনই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখনই কেবল সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা দেখা যায়। ​সিলেটের পাহাড় ও টিলার পাদদেশে কত মানুষ বসবাস করে, তার কোনো সরকারি তালিকা নেই। কেবল পরিবারের একটি হিসাব রয়েছে।

সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের ২৭৯টি পাহাড় ও টিলার মধ্যে ১৬৯টিই ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে গোলাপগঞ্জ পৌরসভার ৫টি পাহাড়ের পাদদেশে ৭টি পরিবার, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৭১টি পাহাড়ের কাছে ৮৮টি পরিবার, বিয়ানীবাজার উপজেলার ৯টি পাহাড়ে ৯টি পরিবার, কানাইঘাট উপজেলার ১টি পাহাড়ে ৩টি পরিবার, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নের ১২টি পাহাড়ে ৩৮টি পরিবার, বিশ্বনাথ উপজেলার ১টি পাহাড়ে ৬টি পরিবার, সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগরের ২৫টি পাহাড়ে মোট ৭০টি পরিবার, খাদিমপাড়ার ১৫টি পাহাড়ে মোট ৩৯টি পরিবার এবং টুকেরবাজারের ২০টি পাহাড়ে ১২৫টি পরিবার বসবাস করছে।

​পরিবেশ কর্মী আবদুল করিম কিম আরও বলেন, প্রভাবশালী চক্র পাহাড় ও টিলা কাটা বা দখল করার উদ্দেশ্যে টিলার পাদদেশে ঘরবাড়ি তৈরি করে ভূমিহীনদের কাছে কম ভাড়ায় তা ভাড়া দেয়। কম ভাড়ার কারণে অনেক পরিবারই এই মৃত্যুর ফাঁদে বসবাস করছে। এর পাশাপাশি পাহাড়-টিলা কেটে এবং এর ঢাল বা শ্রেণি পরিবর্তন করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। আর যখনই টানা বৃষ্টি হয়, তখনই সিলেটে পাহাড় ধসের খবর আসে।

​আবদুল করিম কিম আরও জানান, পাহাড় খেকো সিন্ডিকেটরা অত্যন্ত সুকৌশলে পাহাড় ধ্বংস করেছে। পাহাড়  কেটে তারা দুই ধরনের ফায়দা লুটছে, এক, তারা টিলা ভূমিকে সমতল করে ভূমি দাম বৃদ্ধি করে তা বিক্রি করছে। আর দুই, পাহাড় টিলার মাটি দিয়ে বিভিন্ন জলাশয় ভরাট করছে। এতে করে প্রকৃতির ওপরও দুইভাবে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।

প্রশাসনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদেই এমনটা হচ্ছে বলে করেন পরিবেশবাদীরা। তারা মনেকরেন, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা যোগসাজশে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করছে ভূমিখোকো সিন্ডকেট।

এ বিষয়ে কিম বলেন, প্রশাসন নিয়মিত অভিযান ও আইন প্রয়োগে কঠোর হলে সিলেটের প্রকৃতিতে এ বিপর্যয় দেখা দিত না। এখন সিলেট নগরে মাত্র ৩০ শতাংশ পাহাড় টিলা অবশিষ্ট আছে সেগুলো রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন প্রয়োগে আরও কঠোর হতে হবে এবং নাগরিকদেরও এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

​বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-র স্থানীয় প্রতিনিধিদের মতে, সরকারিভাবে পাহাড়-টিলার সুনির্দিষ্ট ও নিয়মিত হালনাগাদ সংখ্যা প্রকাশ না করা অত্যন্ত দুঃখজনক। সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবকে পুঁজি করেই ভূমিদস্যুরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

শাহজালালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেদওয়ান বলেন, ‘পরিবেশ আইন অনুযায়ী পাহাড় বা টিলা কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, সিলেটে আইনের প্রয়োগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। সিলেটের অবশিষ্ট পাহাড়-টিলাগুলোর ডিজিটাল ম্যাপিং করতে হবে। পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের শুধু জরিমানা নয়, দৃষ্টান্তমূলক জেল ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়গুলোকে পুনরায় বনায়নের আওতায় আনতে হবে।’

এ বিষয়ে বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সিলেটের পাহাড়ে কোনো তালিকা আমাদের কাছে নেই। তবে পাহাড়ের মাটি কাটা রোধে সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তর নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আইনে যা বিধান রয়েছে তা মেনেই কাজ করছি।’

​অন্যথায়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ‘পাহাড় ও চায়ের দেশ’ হিসেবে পরিচিত সিলেট কেবলই এক কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-০৮ ০৬:১০:৪১