আওয়ামী দোসর বিমানবন্দরের ম্যানেজার হাফিজ, বিস্তর অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে

  • প্রকাশের সময় : ২৯/০৫/২০২৬ ০৫:২৮:১৩ AM

Share
176

পতিত আওয়ামী সরকারের আমলের প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এবং সাবেক পলাতক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে এম আব্দুল মোমেনের আশীর্বাদে একক দায়িত্বে গেলো ১৬ বছর ধরে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাফিজ আহমেদ।

চিরকুমার এই হাফিজ আহমেদের বাড়ি সিলেট মৌলভীবাজার জেলায়। বৃহত্তর সিলেটের লোক হয়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সিলেটেই চাকরি করছেন। আর এক পোস্টিংয়ে ৩ বছর চাকরির নিয়ম থাকলেও তিনি এক জায়গাতেই ১৬ বছর ধরে দিব্যি চাকরি করছেন।

বর্তমানে তিনি রাজনৈতিক খোলস পাল্টে বিএনপির সিলেটের এক মন্ত্রীর আশ্রয়ে ম্যানেজার কাম পরিচালকের রুটিনের দায়িত্ব থেকে পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

আওয়ামী সরকার পতনের পর গত ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীদের সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে লন্ডনে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন ম্যানেজার হাফিজ আহমেদ। এমন কথা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ১৬ বছরে নানা অনিয়মের সঙ্গে হাফিজ আহমেদ নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। 

ঠিকাদারি কাজের প্রত্যয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, কাজ না করে বিল উত্তোলন করে ভাগ-বাটোয়ারা, পরিবহন পুলে কেনাকাটা, গাড়ি মেরামতে ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, জ্বালানি তেল চুরি, সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, বাসাবাড়ি, দোকানপাট বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম, বিজ্ঞাপনের জন্য নিয়ন সাইনে দুর্নীতিসহ বহু অনিয়ম-দুর্নীতির রাজা এই হাফিজ আহমেদ। 

নিয়ন সাইন অনিয়মের বিষয়টি সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে।

দীর্ঘদিন সিলেট বিমানবন্দরে ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকায় এই হাফিজ আহমেদ ওসমামী বিমানবন্দর কর্মরত বাইরের জেলার কর্মচারীদের নানাবিধ হয়রানি অত্যাচার, মানসিক নির্যাতন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 

তাঁর অত্যাচারে কর্মচারী আজিজার রহমান মারা গেছেন, রাজু মিয়া রক্তাক্ত জখম হয়েছেন, আনসার বাহিনীর সদস্য হেলালও মার খেয়েছেন। কিন্তু তিনি সিলেটে ঠিকই রাজত্ব করে যাচ্ছেন।

জানা যায়, প্রথমে ১ মাসের দায়িত্ব দিয়ে হাফিজ আহমেদকে ঢাকা থেকে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের ম্যানেজার কাম পরিচালক হিসেবে পাঠানো হয়। সেই থেকে তিনি একচেটিয়া ১৬ বছর ধরে রামরাজত্ব করছেন। 

এই ১৬ বছরে সিলেট বিমানবন্দরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থেকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে হাফিজ আহমেদ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে  বনেছেন শতকোটি টাকার মালিক। রাজধানী ঢাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট এবং নিউইয়র্কে রয়েছে নামে-বেনামে বাড়ি। তিনি আবার আমেরিকার গ্রিন কার্ডধারীও!

বিমানবন্দরে কর্মচারীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ, মারধর, মদ্যপ অবস্থায় গভীর রাতে কর্তব্যরত আনসার বাহিনীর সদস্য হেলালকে মারধর পর্যন্ত করেছেন। 

তাঁর বিচার দাবি করে আনসার বাহিনীর সদস্যরা বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে। এ নিয়ে তদন্ত হয়, পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। এ ঘটনা সাবেক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমানের আমলের।

সিলেট বিমানবন্দরে রয়েছে তাঁর একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট সদস্যরা হলেন- জসিম, শাহেদ, তরিকুল, অরুন। 

কার পার্কিংয়ে অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তার সিন্ডিকেড সদস্যরা যোগাযোগ শাখার কর্মচারী রাজু মিয়াকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। এ ব্যাপরে একটি মামলাও হয়। এই রাজু মিয়া সিএটিসির সাবেক পরিচালক আব্দুল মান্নানের আপন ভাগিনা বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। 

বিমান বন্দরে মুকুটহীন সম্রাট হাফিজ আহমেদ এতটাই অত্যাচারী যে, যোগাযোগ শাখার প্রযুক্তি সহকারী আজিজুর রহমানকে কাজের চাপ প্রয়োগ করার কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে বিষয়টি সিস্টেমে মীমাংসা করে ফেলেন চতুর হাফিজ আহমেদ।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ তাকে আগলে রেখেছে। কারণ পরিচালক মানবসম্পদ। বদলি ঠেকাতে পরিচালক মানবসম্পদ তাকে শেল্টার দিয়ে থাকেন বলেও একাধিক সূত্র জানায়। এ জন্য প্রতি মাসে তাকে হেড অফিসে সালামি পাঠাতে হয় বলে জানিয়েছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি বিশেষ সূত্র। 

ক্ষমতার পালা বদলের পর সরকারের বিভিন্ন সেক্টর থেকে আওয়ামী দোসরদের বদলি করা হলেও সিলেট বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমেদ এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। সিলেটের এক মন্ত্রী উল্টো তাকে বিমানবন্দরের রুটিন পরিচালক থেকে পরিচালক করার পাঁয়তারা করছেন বলে জানা গেছে। 

বিমান বন্দরের একটি সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি তেল চুরি করে অবৈধ অর্থ উপার্জন করা হাফিজের নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমানবন্দরে ব্যবহৃত গাড়িগুলো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, গাড়ি মেরামত না করে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাত, বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পে দায়িত্ব না থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে কাজ অসম্পূর্ণ থাকার পরও প্রত্যয়ন দিয়ে ‘কমিশন’ গ্রহণ, প্রভাব খাটিয়ে আউট সোর্সিং কোম্পানির পরিচ্ছন্ন কর্মীদের নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার তার রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চিরকুমার এই পরিচালক বিমানবন্দরের পাশেই পুরাতন রেস্ট হাউসে একাকী থাকেন। গভীর রাত পর্যন্ত সিলেট ক্লাব লিমিটেডে মদ্যপান এবং অবাঞ্ছিত নারীদের নিয়ে আমোদ ফুর্তি করেন। 

বিমান বন্দরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরের ডিউটি ফ্রী মদ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সিলেট ক্লাব লিমিটেডের পরিচলাক নিশুর ম্যানেজার অশেষ, আজমল এবং আক্তারের কাছে নাজমুলের মাধ্যমে পাঠান হাফিজ। বিনিময়ে তিনি ক্লাব থেকে এক্সট্রা ফ্যাসিলিটি পান নিশুর মাধ্যমে।

চিরকুমার এই হাফিজ আহমেদ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সহকারী অ্যারোডাম অফিসার হিসেবে বেবিচকে ( বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ) যোগদান করেন। সিলেটে ১৬ বছরে পরিচালকগিরি করার সময়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে। 

একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্ট হয়েছে, কিন্তু কোনোটাই আমলে নেওয়া হয়নি। ক্ষমতার পালাবদলে সব জায়গা থেকে আওয়ামী দোসরদের অপসারণ করা হলেও সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের ম্যানেজার কাম পরিচালক হাফিজ বহাল থাকায় সিলেটবাসী আজ চরম ক্ষুব্ধ।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
স্টাফ রিপোর্টার

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ২০২৬-০৫-২৯ ০৫:২৮:১৩