সুনামগঞ্জ পৌরসভা ধার্যকৃত ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার লাইসেন্স মাত্র ৩ হাজার টাকা। কিন্তু বিক্রি হয়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়। অনিয়মের মাধ্যমে রিক্সার নম্বরপ্লেট বিক্রি করে এক বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে একটি সিন্ডিকেট।
পৌরসভার একটি পুরোনো নম্বরপ্লেট ২০ হাজার টাকায় কিনে সুনামগঞ্জ শহরে রিকশা চালাচ্ছেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মথুরকান্দির নূরে আলম সিদ্দিকী। এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, তিনি ২০ হাজার টাকায় নম্বরপ্লেট কিনেছেন। কেবল তিনি নন, অনেক রিক্সা চালক এভাবেই নম্বরপ্লেট কিনেছেন। ঘুরতে ঘুরতে পৌরসভায় গিয়ে লাইসেন্স না পেয়ে এই পথ বেছে নিয়েছেন তারা।
চোখের পানি মুছতে মুছতে নূরে আলম বলেন, যাদের নিজের রিক্সা নেই, তাদের রিকশা ভাড়াও দিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্লেট ভাড়াও দিতে হয়। প্লেটের ভাড়া প্রতিদিন ১০০ টাকা। জুলুম এমন পর্যায়ে গেছে যে, শ্রমিক বাঁচার পথ নেই। সারাদিনে ৫০০-৬০০ টাকা রোজগার হয়। এর মধ্যে রিক্সা ভাড়া দিতে হয় ৩৫০ টাকা। এর পর একটা চাকা লিক হয়ে গেলে ৫০-৬০ টাকা খরচ হয়। অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে তাদের, দেখার লোক নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পৌরসভার হিসাবরক্ষক পার্থ প্রতীম দাসসহ কয়েকজন এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ২০২৩ সালের জুন মাস থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার লাইসেন্স দেওয়া শুরু হওয়ার পর লাইসেন্সের জন্য গেলেই পার্থ জানিয়ে দিতেন, ‘লাইসেন্স নেই।’ অতিরিক্ত চাপাচাপি কিংবা শহরের বিশিষ্ট কেউ অনুরোধ করলে একটি লাইসেন্স দেওয়া হতো। তাও বেশি টাকা দিলে লাইসেন্স পাওয়া যেত।
নাম না প্রকাশের শর্তে সুনামগঞ্জ পৌরসভার একজন প্রকৌশলী বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার লাইসেন্স প্রদানে অনিয়মের বিষয়টি অনেকেই জানেন। পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্তকে অপসারণের পর রিক্সা চালকরা পৌরসভার প্রশাসকের কাছে এসে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন।
ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা মালিক-শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুরাদ আহমেদ খাঁ বলেন, পৌরসভা যখন প্লেটের অনুমতি দিচ্ছিল না, তখন তারা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন। ওই সময় পৌরসভার মেয়র ছিলেন নাদের বখ্ত। তিনি বললেন, ‘যেহেতু তোমরা প্লেটের অনুমতি এনে দিয়েছ, তোমরাই একটি লিস্ট (তালিকা) তৈরি করো।’ পরে তারা তালিকা দিয়েছেন। ওই তালিকার প্রত্যেকে ২০-২৫টা করে নম্বরপ্লেট নিয়েছেন– এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
রিকশাচালক মুর্শেদ আলম অভিযোগ করে বললেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার লাইসেন্স না থাকলে, পুলিশ ধরলে ১ হাজার টাকা না দিলে ছাড়ে না। তারা প্লেট নিতে চান; কিন্তু পৌরসভা প্লেট দেয় না।
আবুল হোসেন নামে এক রিক্সা চালক দাবি করেন, পৌরসভা থেকে তিনি ১০ হাজার টাকায় নম্বরপ্লেট নিয়েছেন। অনেকের কাছ থেকে আরও বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক পৌর মেয়র নাদের বখ্তের ব্যক্তিগত নম্বরে কয়েকবার কল করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পৌরসভার অব্যাহিতপ্রাপ্ত প্যানেল মেয়র আহমেদ নূরের ভাষ্যমতে, পৌর কাউন্সিলররা দুটি করে অটোরিক্সার নম্বরপ্লেট বরাদ্দ পেয়েছেন। এ জন্য প্রতিটি প্লেটের জন্য ৮ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। এই টাকাও রাজস্ব খাতে জমা হয়নি। কেবল ট্রাফিকের নামে দেওয়া ১ হাজার ২০০ টাকার রসিদ পেয়েছেন তিনি। পৌরসভার হিসাবরক্ষক পার্থ প্রতীম দাস অটোরিকশা নম্বরপ্লেট বাণিজ্যের মূল হোতা ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার দাস বলেন, পৌরসভা ধার্যকৃত ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার ফি ৩ হাজার টাকা। ৭০০ রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে গত এক বছরে। এই টাকার হিসাবরক্ষক পার্থ প্রতীমকে নেওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে কারও কারও টাকা রাজস্ব খাতে জমা হয়নি, এমন অভিযোগ শুনেছেন বলে জানান তিনি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে পার্থ প্রতীম দাসের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সুনামগঞ্জ সদরের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মহিবুল ইসলাম বললেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার লাইসেন্স না থাকলে আটক করে ২ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়। আটকে রসিদ ছাড়া টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।
পৌরসভার প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার লাইসেন্স প্রদানে অনিয়মের অভিযোগ শুনেছেন। রিক্সা মালিকদের এ জন্য ডাকা হয়েছিল।
তিনি বলে দিয়েছেন, একজনের দুটির বেশি লাইসেন্স থাকবে না। নবায়নের সময় এগুলো আটকে দেওয়া হবে। কয়েক দিন হয় তিনি পৌরসভার দায়িত্বে নেই। যিনি দায়িত্বে পেয়েছেন, তিনি অফিস করা শুরু করলে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।




















