দীর্ঘ ৬ বছর পর এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা আজ

  • প্রকাশের সময় : ১৪/০৭/২০২৬ ১১:৫৫:২৮ AM

Share
8

সিলেটের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আজ ঘোষণা করা হবে।


ঘটনার দীর্ঘ ৬ বছর পর বুধবার (১৪ জুলাই) সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এই বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করবেন। রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণসহ সিলেটে ব্যাপক নিরাপত্তা ও জনমনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।


সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন জানান, ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই রায় ঘোষণা করবেন। এর আগে গত সপ্তাহে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন (১৪ জুলাই) নির্ধারণ করেন।


সেদিন যা ঘটেছিল

২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এক তরুণী (২০) তাঁর স্বামীর সাথে প্রাইভেটকারে করে শাহপরাণ (রহ.) মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে তাঁর স্বামী পার্শ্ববর্তী একটি দোকানে প্রবেশ করেন। এই সুযোগে ৫/৬ জন উশৃঙ্খল তরুণ এসে তাঁদের জিম্মি করে এবং প্রাইভেটকারসহ তাঁদের জোরপূর্বক বালুচর এলাকায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়।


সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে ও মারধর করে ওই তরুণীকে ছাত্রাবাসের ভেতরে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। পরে স্বামীর টাকা-পয়সা ও প্রাইভেটকার রেখে দিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়েই ভুক্তভোগীর স্বামী বিষয়টি পুলিশকে জানান। কিন্তু অভিযুক্তরা তৎকালীন প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ায় প্রথমে পুলিশ ছাত্রাবাসে প্রবেশে গড়িমসি করে বলে অভিযোগ ওঠে। সেই সুযোগে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। তবে পরবর্তীতে পুলিশ ছাত্রাবাসে রাতভর অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে।


এ ঘটনায় তরুণীর স্বামী বাদী হয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন।


অভিযুক্ত ও বহিষ্কৃত যারা

ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তীব্র দেশব্যাপী প্রতিবাদের মুখে তিন দিনের মধ্যে মূল ৬ আসামি ও সন্দেহভাজন ২ জনসহ মোট ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র‍্যাব। পরে আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে অপরাধ স্বীকার করেন। ডিএনএ টেস্টেও আসামিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে। ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন পরিদর্শক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।


অভিযুক্তরা হলেন— সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল এবং মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন। এছাড়া রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্ত ৮ জনকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে এবং পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁদের ছাত্রত্ব ও সনদ বাতিল করে।


যেভাবে সম্পন্ন হলো বিচার প্রক্রিয়া

২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর ধর্ষণ মামলা এবং ২২ নভেম্বর অস্ত্র ও চাঁদাবাজি মামলার অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। তবে বাদীপক্ষ দুটি মামলার বিচার একসাথে একই আদালতে করার আবেদন জানালে হাইকোর্ট ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দুটি মামলার কার্যক্রম একসাথে চালানোর নির্দেশ দেন।


পরবর্তীতে বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে বাদীপক্ষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের জন্য হাইকোর্টে রিট করেন। সর্বশেষ দেশের রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের পর গত বছরের মে মাসে মামলাটি নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।


এই মামলায় ভুক্তভোগী গৃহবধূ, তাঁর স্বামী, স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট, তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকসহ মোট ২৪ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ বুধবার এই নৃশংস ও কলঙ্কজনক ঘটনার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে।


সিলেট প্রেস / aa


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক

সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০২৬-০৭-১৪ ১১:৫৫:২৮