যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন: দিনে বন্ধ, রাতে ‘লুট’

  • প্রকাশের সময় : ২৭/০৪/২০২৬ ০৪:১২:০৫ PM

Share
19

তাহিরপুরের যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন ঘিরে অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগের যেন শেষ নেই। হাওরে বোর ধান কাটা মাড়াইয়ের শ্রমিক সংকট দূর করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসন ওখানে বালু উত্তোলন আপাতত বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। নদীতে মাইকিং করে এই নির্দেশনা কার্যকর করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ঘোষণাও আমলে নিচ্ছে না বালু খেকোরা। উল্টো এই সময়ে দিনে কার্যক্রম বন্ধ রেখে রাতের আঁধারে চলছে ড্রেজার মেশিনে পাড় কাটার তাণ্ডব। এতে পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয় জনজীবনও হুমকির মুখে পড়ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল নদীর পাড় কাটা বন্ধ এবং ধান কাটা মৌসুমে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখতে টহল জোরদার করতে নৌযানের ব্যয় বাবদ শনিবার এক লাখ টাকা অনুদানও দিয়েছেন। 


স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৈশাখ মাসে হাওরে শ্রমিক সংকটের জন্য বালু মহাল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হলেও রাত নামলেই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে সরব হয়ে উঠছে ড্রেজার মেশিন। অন্ধকারের সুযোগে নির্বিঘ্নে চলছে বালু উত্তোলন কার্যক্রম।


অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ড্রেজার থেকে প্রতিরাতে ৩০ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এই অর্থ স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহলের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক বাসিন্দা। ক্ষুব্ধ ওই বাসিন্দারা বলেছেন, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুনাব আলীর কাছে এরা আস্কারা পায় বলেও স্থানীয়ভাবে কথা রয়েছে।


উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুনাব আলী বললেন,‘আমি নদীর ইজারাদার নই, কোন কর্তৃপক্ষও নই। তাহিরপুরের সবচেয়ে বড় হাওর শনিতে এখনো ৭০ ভাগ ধান কাটা হয় নি। আমরা এই মৌসুমে বালু উত্তোলন বন্ধ রেখে ধান কাটায় যাওয়ার জন্য শ্রমিকদের উৎসাহিত করছি। পাড় কাটার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান আমাদের। সংসদ সদস্য নদীতে টহল জোরদারের জন্য খরচ বাবদ এক লাখ টাকা অনুদানও দিয়েছেন। আমি আস্কারা দেই, যারা বলেছে, তারা ঠিক বলে নি। এরা আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চায়।’


স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ড্রেজার মেশিনে উত্তোলিত বালু নদীর পাড়ের বিভিন্ন জায়গায় স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পরে সেখান থেকে বড় স্টিলবডিতে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। ইজারাদারদের প্রতিনিধিরাও ওই বালু থেকে রয়্যালটি আদায় করছেন। 


অভিযোগ রয়েছে, মিয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা ইকরাম ও সুমন মিয়াসহ কয়েকজন ব্যক্তি সরাসরি এই টাকা উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। 


এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইকরামের ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও ফোন রিসিভ না করায় তার সঙ্গে কথা বলা যায় নি। সুমন মিয়া বললেন, তিনি এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়, কয়েকদিন তিনি নিজেও নদীতে ড্রেজার চালিয়েছিলেন। লাভ না হওয়ায় বাদ দিয়েছেন। গেল কয়েকদিন হয় নদীতে ড্রেজার বন্ধ রয়েছে বলেও দাবি তার।


তিনি বলেন, প্রশাসন কেনো আমার কথা শুনবে, আমি কি রাজনীতি করি, ছোটখাটো ব্যবসা আমার, কারা এসব করে তিনি জানেন না বলে ফোন কেটে দেন। 
মিয়ারচরের একজন বাসিন্দা বললেন, পরিচয় উল্লেখ করলে বাড়িতে এসে মারপিট করবে, দয়া করে পরিচয় লিখবেন না। নদী দিনে বন্ধ থাকলেও রাত হলেই কমপক্ষে একশ’ ড্রেজার চালু হয়। প্রতিটি ড্রেজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। যারা টাকা তুলে তারা নিয়মিত আসে, আর পুরো বিষয়টি উপজেলা থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি শুরু হওয়ায় গত তিন দিন হয় ড্রেজার কমেছে।


বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল আওয়াল বললেন, তিন দিন হয় ড্রেজারের উৎপাত কম। দুয়েকজন রাজনৈতিক নেতা, বাদাঘাটের কয়েকজন সাংবাদিক ও পুলিশের হয়ে কয়েকজন ব্যক্তি টাকা তুলেতে শুনেছি ওখানে। তাদের নাম প্রকাশ করলে ঝামেলায় পড়তে হবে। এজন্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি।


যাদুকাটা নদী জেলার সবচেয়ে বড় বালু মহাল হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর চৈত্র মাসে ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও এবার ইজারাদারদের দাবি, উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইজারার মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। 
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসনের ঘোষণার পরও নদীতে এভাবে কার্যক্রম চলার জন্য তাহিরপুরের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নীরবতার সুযোগেই নদীজুড়ে ড্রেজারের কার্যক্রম চলছে। এরসঙ্গে কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত রয়েছে। 


সদ্য যোগদানকৃত জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, বিষয়টি শোনার পর তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।


পরিবেশবিদদের মতে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে এবং ভাঙন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তারা দ্রুত এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে কঠোর নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


সুনামগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি একেএম আবু নাসার বললেন, যাদুকাটা নদীতে বালু নেই। তারা পাড় কেটে বালু নিচ্ছে। দিনে রাতে ড্রেজার চালানোয় পাড় ভেঙে নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। 


যাদুকাটা নদীর ইজারাদার ও দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাছির মিয়া বলেন, উচ্চ আদালতে রিট করার পর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমরা সময় পেয়েছি। তবে হাওরে শ্রমিক সংকটের কারণে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। আমাদের কেউ রয়েলিটি আদায় করছে না।


তিনি আরও বলেন, নদীতে আমরা ড্রেজার চালাই না। গত কয়েকদিন ধরে রাতে ড্রেজার চলার খবর পেয়ে প্রশাসনকে অবগত করেছি। তারা ব্যবস্থা নিয়েছেন।
তাহিরপুর থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম জানালেন ভিন্ন কথা। তিনি বললেন, রাতে নদীতে কোনো ড্রেজার চলে না। ইজাদারের পক্ষ থেকেও মৌখিক বা লিখিতভাবে কোন অভিযোগ করা হয় নি। 


অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, ইজারাদার উচ্চ আদালতে রিট করে আমাদের নতুন করে ইজারা বিজ্ঞপ্তির স্থগিতাদেশ ও আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা ভোগ দখলে থাকার একটি আদেশ নিয়ে এসেছে। আমরা এমন আদেশের বিরুদ্ধে আপীল করেছি। এখনও শুনানীর তারিখ পড়েনি। শুনানী হলে পরে বলা যাবে, তাদের মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে, নাকি আমরা নতুন করে ইজারা প্রদান করবো।



জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, যাদুকাটা নদীতে রাতে ড্রেজার চলার খবর শুনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এরপরেও যদি চলে, আমরা আরও কঠোর ব্যবস্থা নেবো।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স

প্রকাশ: ২০২৬-০৪-২৭ ১৬:১২:০৫