সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ উদ্বোধনের প্রায় এক মাস হয়ে গেলেও এখনো অর্ধেকের বেশি প্রকল্পে কাজ শুরু হয়নি।
বিলম্বিত কাজ টেকসই হবে না এবং হাওরের বোরো ফসল পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে থাকবে- এই উদ্বেগ জানিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন কৃষক নেতারা।
তারা বাঁধের কাজে বিলম্ব হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি-পিআইসি গঠন, অনুমোদনসহ বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগও করেছেন। ফসলের স্বার্থে দ্রুত বাঁধের কাজ শুরু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয় থেকে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জেলার ছোট বড়ো ৪২টি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ, সংস্কার ও মেরামতে ৭০৫টি পিআইসি (প্রকল্প) অনুমোদন দিয়েছে জেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি। ১৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চলতি বছর প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজ নির্মাণ করার কথা। শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় ২০০টি পিআইসি কাজও শুরু করেনি।
তবে সরকারের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রায় তিন শতাধিক পিআইসি কাজ শুরু করেছে।
এবার জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কাবিটা নীতিমালা অনুসারে, ১৫ ডিসেম্বর বাঁধের কাজ শুরু হয়েছিল। এটাকে ‘নিয়মরক্ষার’ উদ্বোধন বলে মন্তব্য করেছেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা। বিলম্বে কাজ শুরু করায় ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অর্ধেক কাজও শেষ হবে না বলে আশঙ্কা তাদের।
৭ জানুয়ারি হাওর বাঁচাও আন্দোলন সংবাদ সম্মেলন করে বাঁধের কাজে বিলম্বের পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করেছে। সংবাদ সম্মেলনে বিলম্বে কাজ শুরু ও কাজ এখনো শুরু না করায় উদ্বেগ জানানো হয়।
কৃষকরা জানান, পিআইসি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হলেও এখনো সবগুলো কমিটি গঠন করা হয়নি। কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী, স্থানীয় কৃষকদের নেতৃত্বে এই কাজ বাস্তবায়ন হয়ে আসছে ২০১৭ সালের হাওরের ফসলডুবির পর থেকে।
কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটির হয়ে জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা প্রকল্প গ্রহণ, অনুমোদন করে থাকেন। বাস্তবায়ন করেন স্থানীয় কৃষকরা।
তবে কৃষকদের বদলে এখন একটি মধ্যস্বত্ত্বভোগী বাঁধের কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।
পাউবো সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয় জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ৪২টি হাওরের এক হাজার ১১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সার্ভে করে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে প্রকল্প নেয়।
শুক্রবার দেখার হাওরের চাতল বিল, উথারিয়া বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কোথাও বাঁধের কাজ শুরু হয়নি। উথারিয়া বাঁধ প্রায় অক্ষত। কৃষকরা জানালেন, কয়েক দিন আগে এক্সাভেটর এসে বাঁধের মাটি খুড়ে গেছে। কোনো মাটি না ফেললেও পুরনো বাঁধটিকে নতুন দেখাচ্ছে। তাই তাদের আশঙ্কা এখানে মাটি না ফেলেই পুরো বরাদ্দ নয়-ছয় হয়ে যেতে পারে।
দেখার হাওরপাড়ের গ্রাম জয়কলসের কৃষক জহুর উদ্দিন বলেন, “আমাদের হাওরের চাতলবিলের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ এখনো শুরু হয়নি। কবে পিআইসির লোকজন কাজ শুরু করবে আমরা জানি না। কাজ যাতে শুরু হয় এবং সুন্দর ও নিয়ম করে বাঁধে মাটি দেওয়া হয় এটা নিশ্চিত করতে হবে।”
একই কথা বলেন গ্রামের কৃষক মারজান হোসেন। তার ভাষ্য, “আমরা চাই বান্দটা যাতে তারা সুন্দর করে দেয়।”
একই হাওরের আস্তমা গ্রামের কৃষক শফিকুন নূর বলেন, “উতাইরা বান্দে যত জলদি বান্দ অইবো, অতো বালা। মেগ বাদলি পড়লে আর কাজ করা যাইতো না। তখন বান্দ ভাঙ্গি যায়। এখনো বান্দের কাজ শুরু না হওয়ায় আমরা কিছুডা চিন্তায় আছি।”
গ্রামের আরেক কৃষক রাহাত আহমদ বলেন, “উতাইরা আউরো এবতরি কাম শুরু অইছে না। বান্দো দ্রুত কাজ না করলে পাইন্যে আমরার ক্ষেত নষ্ট করিলায়। আগতারি না বান্দলে ফসল পানিতে ডুইব্যা নষ্ট অই যায়।”
তিনি বলেন, “তিন-চার দিন আগে এক্সাভেটর এসে বাঁধের মাটি খুঁড়ে গেছে। এখন বাঁধগুলা নতুন দেখা যাচ্ছে। তবে বাঁধে নতুন এক চিমটি মাটিও দেয়নি।”
আস্তমা গ্রামের আরেক কৃষক আজিম উদ্দিন বলেন, “আউরোর বান্দ না অইলে আউরের সব ফসল ডুবি যায়। কিন্তু তারা ইবারও এখনো কাজ শুরু করছে না। অন্যান্য বছরও দায়সারা কাজ হয়েছিল। এবার কাজই শুরু হয়নি। আমরা চাই দ্রুত বাঁধের কাজ শুরু হোক।”
সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, “১৫ ডিসেম্বর নিয়মরক্ষার জন্য পিআইসির বাঁধের কাজ শুরু হয়েছিল। এরপর আর কোথাও কাজ শুরু হয়নি। এখনো অনুমোদিত প্রকল্পের তিন ভাগের একভাগও কাজ শুরু হয়নি।
“তাছাড়া এবারও বাঁধে অতিরিক্ত বরাদ্দ, অক্ষত প্রকল্পে বিপুল বরাদ্দ অনুমোদনসহ পিআইসি গঠনেও অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। বিলম্বে কাজ হলে টেকসই হয় না এবং ফসল ঝুঁকির মধ্যে থাকে।”
পাউবো সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, “হাওরে এখনো পানি নামেনি। পানি নামতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি হয়ে যায়। তবে আমাদের লোকজন ও প্রশাসনের লোকজন মাঠে আছেন এবং নজরদারি করছেন। এখন কাজের গতি কম থাকলেও আশা করি ১৫ জানুয়ারির পর সার্বক্ষণিক কাজ শুরু করা যাবে।”




















