এক লিজেই পুরো উপজেলা জিম্মি” গোয়াইনঘাটে ‘বালু লুট’ সিন্ডিকেট, দৈনিক লুট কোটি টাকা

  • প্রকাশের সময় : ২১/০৬/২০২৬ ০৮:৫২:৫১ PM

Share
8

সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্য দিবালোকে চলছে বালু ও পাথর লুটের এক মহোৎসব। পরিবেশ আইন ও ইজারার শর্ত ভেঙে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র, রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ও প্রশাসনের একাংশ মিলে পিয়াইন নদী, গোয়াইন নদী, ডাউকি অববাহিকাসহ হাজিপুর-আহারকান্দি বালু মহালকে চরম ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে সম্পূর্ণ ‘ম্যানেজ’ করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ধ্বংস করছে এই চক্রটি। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেখাতে মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না; বরং নির্বিঘ্নে বালু লুটের সুযোগ করে দিয়ে প্রতিদিন থানার ওসির কাছে চলে যাচ্ছে ভাগের টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর সিলেটের জেলা প্রশাসন (রাজস্ব শাখা) থেকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় মাত্র একটি বালু মহাল ইজারা দেওয়া হয়। ‘হাজিপুর-আহারকান্দি’ নামের এই মহালটি ২৬ কোটি টাকায় ইজারা নেন ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’-এর কর্ণধার আব্দুল্লাহ আল মামুন, যিনি কোম্পানীগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আলফুর ভায়রা হিসেবে পরিচিত। গত ১৬ এপ্রিল আব্দুল্লাহ আল মামুন মহালটির দখল বুঝে নেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করতে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ অন্তত ৪০ জন বিএনপি, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও যুবদল নেতাকে এই ব্যবসায় অংশীদার করেন। ইজারার শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত দাগ ও মৌজার ভেতরে নির্দিষ্ট উপায়ে বালু উত্তোলন করার কথা থাকলেও, এই বিশাল রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের শেল্টারে প্রায় ১১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন ও রয়্যালটি কালেকশন।

গোয়াইনঘাট থানা লেবার ফেডারেশনের সভাপতি মদরিছ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, গত ১৩ এপ্রিল এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে বালু মহালের সীমানায় লাল পতাকা টাঙিয়ে নির্দিষ্ট দাগ-খতিয়ান স্পষ্ট করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন সেই চিঠির তোয়াক্কা না করে ‘ঝুমলা’ বা দাগ-খতিয়ান উল্লেখ না করেই লিজ দিয়ে দিয়েছে, যার ফলে প্রশাসনই ইজারাদারকে বাইরে বেআইনি কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। আর এই সুযোগে সদর ইউনিয়নের ভেতরে পরগনা বাজার, তিতরাই ও লাঠি পশ্চিমপাড়ে অবৈধ ক্যাম্প বসিয়ে রসিদের মাধ্যমে বেপরোয়া রয়্যালটি আদায় করা হচ্ছে। বালুর নির্ধারিত রয়্যালটি প্রতি ফুট ৫ টাকার স্থলে জোরপূর্বক ১০ টাকা হারে আদায় করায় একটি ২০০ ফুটের ট্রাক এবং সাধারণ নৌকাগুলো থেকে ১ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে।

সরকারি নির্দেশনায় নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতি বা হাতে তোলার স্পষ্ট নিয়ম থাকলেও গোয়াইনঘাটে রাত গভীর হতেই ওসির মদদে নদী ও ফসলি জমি খুঁড়ে বালু তুলতে ব্যবহার করা হচ্ছে দানবীয় এক্সকাভেটর ও নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’। দক্ষিণ প্রতাপপুর ও কন্যাঙ্গল নদীর প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর বুক ঝাঁঝরা করে ফেলার কারণে বিলীনের পথে স্থানীয় ঘরবাড়ি, স্কুল, মসজিদ, কবরস্থান ও রাস্তাঘাট। এই ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নিজের দায় এড়াতে ডিসি অফিসের ইজারাদারদের দায়ী করেন এবং দোষ চাপান এডিসি রেভিনিউয়ের ঘাড়ে। তার সোজা বক্তব্য— তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইজারাদারদের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়ার, তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং এখানে তার আর কিছু করার নেই।

কোথায় কতটুকু জায়গার লিজ দেওয়া হয়েছে তার নির্দিষ্ট তথ্য কাগজে না থাকায় ইজারাদাররা পুরো উপজেলাকেই ইজারার অন্তর্ভুক্ত মনে করে লুটপাট চালাচ্ছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নীরব দর্শক গোয়াইনঘাট থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় কয়েক কোটি টাকা দিয়ে ইজারাদাররা ওসিকে ‘কিনে নিয়েছে’। সদর বিট অফিসার ও পশ্চিম জাফলং বিট অফিসারের মাধ্যমে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা ওসির পকেটে যায় বলেই পুলিশ নদী ও পরিবেশ রক্ষায় সম্পূর্ণ নীরব। লোকদেখানো অভিযানের সময়ও কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই টাকার ব্যাগ নিয়ে পুলিশ সদস্যরা ফিরে আসেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। 

গতকাল মঙ্গলবার অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের সময়ে হাজিরে ঘটে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা। এসময় লোকজন অভিযোগ করেন, ডিসি অফিস থেকে ইজারা দেওয়ার সময় বালুর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ থেকে আড়াই টাকা। কিন্তু সেখা ইজারা স্থল থেকে প্রতি ফুটে নেওয়া হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা করে। আবার ইজারা ছাড়া জায়গায় উত্তোলনেও আদায় করা হচ্ছে প্রতিফুর বালুর দাম ৮ থেকে ১০ টাকা করে।

এই বিশাল সিন্ডিকেটের এলাকাভিত্তিক নেতৃত্ব ও অর্থ বণ্টনের সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সদর ইউনিয়ন পরগনা বাজার নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের নেতৃত্বে রয়েছে লোমান, হুনা মিয়া মেম্বার, জুনাব আলী ও আতিক গং। অন্যদিকে সদর ইউনিয়ন লাটি নদী এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল হোতা হিসেবে কাজ করছে বাবুল ও হুমায়ুন গং। এছাড়া পশ্চিম জাফলং ইউনিয়ন হাজিপুর নদী এলাকায় পরিবেশ ধ্বংসের রাজত্ব কায়েম করেছে ভিন্নরূপী আমির উদদীন, এনাম, আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল, আজিজ মেম্বার ও দেলোয়ার গং।

অবৈধ উপায়ে ড্রেজার ও বোমা মেশিন চালিয়ে নির্বিঘ্নে বালু উত্তোলন নিশ্চিত করতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা বিভিন্ন মহলে বণ্টন করা হয়। এই ম্যানেজ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কামরুল, খায়রুল ও দেলোয়ার গংদের নিয়ন্ত্রিত ‘লাটিয়ান বাহিনী’র জন্য প্রতিদিন ২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকে। রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল ও বাবুল গংদের নেতৃত্বাধীন রাজনীতিবিদ সিন্ডিকেটের পেছনে দৈনিক খরচ করা হয় ১ লক্ষ টাকা। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ রাখতে এবং গণমাধ্যমকে নীরব রাখতে আমির উদদীন গংদের মাধ্যমে ‘সাংবাদিক ম্যানেজার ফান্ড’ নামে প্রতিদিন ৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গণমাধ্যমকর্মীদের নাম ভাঙিয়ে বিতরণ করা হয়। কারা এই সুবিধাভোগী সাংবাদিক, তা নিয়ে ইতিমধ্যে সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

পরিবেশ আইনবিদ ও সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, যতক্ষণ না স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লোকদেখানো নাটক বন্ধ করে কঠোর ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করবে, ততক্ষণ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়। গোয়াইনঘাটের নদী, ফসলি জমি ও পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে এই ‘বোমা মেশিন’ সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের এবং তাদের সহায়তাকারী প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-২১ ২০:৫২:৫১