সিলেটে ভয়ংকর ‘ডাক্তারি কারখানা’: গোয়েন্দা নজরদারিতে আনহার ও বাহার দুই ভাই

  • প্রকাশের সময় : ২১/০৬/২০২৬ ০৮:৪৯:৪৮ PM

Share
7

সিলেট জেলা ও মহানগর জুড়ে জাঁকজমকপূর্ণ চেম্বার খুলে বছরের পর বছর ধরে সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে বাহার উদ্দিন ও আনহার উদ্দিন নামের আপন দুই ভাই। কোনোদিন কোনো মেডিকেল কলেজ, ইউনানি প্রতিষ্ঠান কিংবা সাধারণ উচ্চ বিদ্যালয়ের বারান্দায় পা না রেখেও নামের আগে বড় অক্ষরে ‘ডাক্তার’ পদবি জুড়ে দিয়ে তারা এলাকায় গড়ে তুলেছে এক ভয়ংকর ও বিস্তৃত প্রতারণামূলক সাম্রাজ্য। বর্তমানে এই দুই ভুয়া চিকিৎসকের অপকর্মের সমস্ত খতিয়ান ও নথি প্রশাসনের শীর্ষ মহলের টেবিলে পৌঁছেছে এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তারা রয়েছেন গভীর গোয়েন্দা নজরদারিতে।

​যেভাবে শুরু এই প্রতারণার সাম্রাজ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, এই পুরো জালিয়াত চক্রের নেপথ্যের মূল কারিগর ও মাস্টারমাইন্ড হলেন বড় ভাই বাহার উদ্দিন। একসময় বিয়ানীবাজার কলেজ থেকে কোনোমতে লেখাপড়া শেষ করে একটি ওষুধ কোম্পানির সেলম্যান (বিক্রয় প্রতিনিধি) হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু অল্প দিনে রাতারাতি প্রচুর অর্থ উপার্জনের লোভে তিনি নিজেকে ‘বড় ডাক্তার’ হিসেবে ঘোষণা করেন। নিজের অর্জিত ডিগ্রির উৎস হিসেবে ভারতের একটি কথিত মেডিকেল কলেজের ভুয়া সার্টিফিকেট ব্যবহার করলেও বাস্তবে ভারত বা অনলাইন—কোথাও সেই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব বা নথিপত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি।

​অন্যদিকে তার ছোট ভাই আনহার উদ্দিন সম্পূর্ণ নিরক্ষর এবং একজন সাধারণ হাতুড়ে কর্মী। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও বড় ভাইয়ের হাত ধরে নামের আগে পিছে বাহারি রঙের আকর্ষণীয় ও লোভনীয় সব ভুয়া পদ-পদবি ব্যবহার শুরু করেন তিনি। সিলেট নগরীসহ কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও জালালপুরের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজারে রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে ও মাইকিং করে নিয়মিত রোগী দেখছেন এই ব্যক্তি।
​অপচিকিৎসা, রোগীর মৃত্যু ও স্থান পরিবর্তন
নিজেদের মূলত ‘ন্যাচারোবেদ’ ও ‘আয়ুর্বেদিক’ চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার বা অপারেশন ছাড়াই পাইলস, ওরিস, গেজ এবং নাকের পলিপাসের মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল রোগ শতভাগ নিরাময়ের গ্যারান্টি দিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন ছাড়ে এই চক্র। তাদের এই পাতা ফাঁদে পা দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সরল-সোজা রোগীরা রোগভেদে সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খুইয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

​স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বছর দুয়েক আগে সিলেটের লামাবাজারে কালিপদ নামের আরেক কথিত ভুয়া চিকিৎসকের সাথে যৌথভাবে একটি চেম্বার খোলেন আনহার। সেখানে তার ভুল ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসায় এক রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হলে এবং লোকমুখে বিচার-সালিশের তোড়জোড় শুরু হলে চতুর আনহার চেম্বার গুটিয়ে রাতারাতি ওই এলাকা থেকে পালিয়ে যান।
​প্রতারণার এই ধারা বজায় রাখতে আনহার বেশিদিন এক জায়গায় চেম্বার টিকিয়ে রাখেন না। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর অথবা ভুল চিকিৎসায় কোনো কেলেঙ্কারি ঘটলে সে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে অন্য উপজেলায় গিয়ে নতুন ফাঁদ পাতেন। কোনো ভুক্তভোগী রোগী যদি টাকা ফেরত চায় বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেয়, তবে আনহার ও বাহার সমাজ ও মিডিয়ার বড় বড় প্রভাবশালী সাংবাদিকরা তাদের আত্মীয় বলে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।

​পারিবারিক জালিয়াতি ও মামলার পাহাড়
এই দুই প্রতারকের মূল বাড়ি গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের লাটিগ্রাম গ্রামে হলেও বর্তমানে তারা জালিয়াতি ও পেশীশক্তি খাটিয়ে সিলেট নগরীর শাহপরাণ থানাধীন ছড়ারপার এলাকায় একটি ভূমি জবরদখল করে সেখানে সুরম্য আবাসে রাজকীয় জীবনযাপন করছেন। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, নিজেদের পরিবারের আপনজনদের সাথেও ভয়ংকর জালিয়াতি করেছে এই চক্র। এদের জমি জবরদখল ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে খোদ তাদের আপন ভাগনে সৌদি প্রবাসী রিপন (৫৫) (যার মূল বাড়ি কানাইঘাট উপজেলার বড়দেশ এলাকায়) বাদী হয়ে আদালতে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করেছেন। রিপনের দাবি অনুযায়ী, এই দুই প্রতারক বর্তমানে যে বাসায় বসবাস করছেন সেই জায়গার প্রকৃত মালিকও তিনি; কিন্তু ক্ষমতার দাপটে কোথাও তিনি ন্যায়বিচার পাচ্ছিলেন না। এছাড়া বর্তমানে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি চাঁদাবাজি ও জালিয়াতির মামলাও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সাইনবোর্ড জাল করা এবং ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করাই এদের মূল পেশা।

​রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপকর্মের রাজত্ব
বিগত ১৭ বছরের রাজনৈতিক শাসনের ছত্রছায়ায় এই চক্রটি তাদের সমস্ত অপকর্ম নির্বিঘ্নে চালিয়ে গেছে। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আব্দুর রহমান জামিলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং অনুগত ‘চামচা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বড় ভাই বাহার উদ্দিন। এই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সে দীর্ঘদিন ধরে 'বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন' সিলেট জেলা ও মহানগরের সভাপতির পদ অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল। মহানগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের রাজনীতিতেও ছিল তার ব্যাপক দাপট।
​অন্যদিকে ছোট ভাই আনহার উদ্দিন নিজেকে 'বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন' মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শাহপরাণ এলাকার কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এর দায়িত্বে ছিলো। একই সাথে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও খাদিমপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আফসরের ‘ডান হাত’ এবং অন্যতম ক্যাডার হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিল সে। কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা আইনি ঝামেলা হলেই তারা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহমান জামিলের নাম ব্যবহার করে পার পেয়ে যেত। ক্ষমতার দাপট এমন পর্যায়ে ছিল যে, তারা যখন-তখন টাকার বিনিময়ে ‘আওয়ামী লীগের সার্টিফিকেট’ বিতরণের মতো হাস্যকর জালিয়াতি ও পদ বাণিজ্য করত।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই সংগঠনের জেলা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জকিগঞ্জ উপজেলার আরেক ভূয়া ডাক্তার জাকারিয়া আহমদ। তাকে বাদ দিয়ে পরবর্তীতে সিলেট নগরীর বাসিন্দা সাগর নামের এক সাংবাদিককে সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে বাহার চক্রের ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভ ও আদর্শগত মিল না থাকায় ওই সাংবাদিক স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তবে এর আগেই ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক এক বিজ্ঞপ্তিতে  আদর্শগত কারণ দেখিয়ে ওই সাংবাদিকসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের ১৩ জন নেতাকর্মীকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি ও বহিষ্কার করেন। তৎকালীন সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যম প্রথম আলো, যুগান্তর, সমকাল, আজকের পত্রিকা, সিলেটের ডাক ও শ্যামল সিলেটে এই বহিষ্কারের খবরটি ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এই বিষয়টি নিয়ে সেই সাংবাদিকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু উনাকে পাওয়া যায়নি। তবে আমরা উনার বক্তব্য নিতেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
এই সংগঠনের প্রচার সম্পাদক দায়িত্বে ছিলেন ক্রাইম সিলেট পত্রিকার সম্পাদক  আবুল হোসেন (যার বাড়িও বাহার ও আনহারের নিজ এলাকায়) উনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কার্যালয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।

রমিজ উদ্দিন নামের ওই মানবাধিকার কর্মী দাবি করেন বাহার ও আনহার যখন খুশি যাকে তাকে ব্যবহার করত। কাজ শেষ হয়ে গেলে দূরে ঠেলে দিত এটাই তার আদর্শ।

বিগত সিটি নির্বাচনের সময় নির্বাচনে আমি বাহারে সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। এ সময় তিনি পেশা হিসেবে ডাক্তারি দিলে কমিশনের কার্যালয়ের সামনেই আহারের  ভাই বাহার উদ্দিনকে ‘ভূয়া ডাক্তার’ হিসেবে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছিলাম। সে সময় কমিশনের পক্ষ থেকে এবং স্থানীয় সচেতন মহলের পক্ষ থেকে তাকে চিকিৎসকের ন্যূনতম কোনো সার্টিফিকেট বা শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হলে, তথাকথিত ডাক্তার বাহার কোনো ধরনের কাগজপত্র দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন এবং তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন।

এ বিষয়ে আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করি বাহার ও আনহারে জালিয়াতের শিকার তাদের ভাগ্না রিপনের সাথে। তিনি আমাদের অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন।

তিনি জানান তার একটি জ্বালিয়াতি মামলায় ডাক্তার বাহার প্রায় ২০ দিন কারাবরণ করে কিন্তু কারাগার থেকে বেরিয়ে তার বিরুদ্ধে উল্টা মৃত্যু মামলা দিতে শুরু করে। ভুয়া ডাক্তার আনহারের বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজি ও জালিয়াতির মামলা।
আনহারের নিজগ্রাম লাটিতে গিয়ে আমরা তাদের বিষয় জানতে চাই। সেখানে লোকজন জানান, এরা এলাকার জালিয়াত ও সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক। তার আপন আর চাচাতো ভাই ভাতিজাদের সাথে মামলা চলমান রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা হলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে না।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে, আনহারের কয়েকটি চেম্বারে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। আর ডাক্তার বাহারে চেম্বার বন্ধ রয়েছে। ফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাই তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আগামী পর্বে অবশ্যই তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
​সিলেটের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে গড়ে ওঠা এই ‘মেডিকেল মাফিয়া’ চক্র ও তাদের ডিজিটাল প্রতারণা বর্তমানে পুরো সিলেটের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরীহ মানুষের জীবন বাঁচাতে, এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য খাতকে কলঙ্কমুক্ত করতে এবং এই ভয়ংকর প্রতারক দুই ভাইকে অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে এখন সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-২১ ২০:৪৯:৪৮