সম্প্রতি সিলেটে মাজার ব্যবস্থাপনা ও একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করেছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেটের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
রোববার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
‘ডিসি’ সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারকে মাজার ভক্তরা ‘ওলির সঙ্গে বেয়াদবির খেসারত’ বললেও অপর একটি পক্ষ বিষয়টিকে মাজারে ‘মদ গাঁজার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় একজন ভালো প্রশাসকের পরিণতি’ বলছেন।
এদিকে রোববার সন্ধ্যায় সদ্য বিদায়ী সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম কালবেলাকে বলেন, ‘বদলি কারণে-অকারণে হতে পারে। সরকার যখন যেখানে যাকে দিয়ে কাজ করাতে চায় সেখানেই যেতে হবে।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটি ভালো কাজ শুরু করেছিলাম, শেষ করা গেলো না। অনেকের পেটে হাত পড়ায় তারা এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে।’
জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা নিয়ে নেওয়া কিছু উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসেন তিনি। বিশেষ করে মাজারে থাকা দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন এবং ঐতিহাসিক তিনটি ‘দানের ডেগ’ সিলগালা করার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
গত ১৮ জুন বিকেলে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়।
এক পক্ষ এ উদ্যোগকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলেও অন্য পক্ষ একে ঐতিহ্যবিরোধী, অযাচিত হস্তক্ষেপ ও জেলা প্রশাসকের বাড়াবাড়ি হিসেবে অভিহিত করলেও আসছিলেন। প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেন অনেকে।
দায়িত্ব নিয়ে যেসব কাজে হাত দেন ডিসি
সিলেটের সাদাপাথর লুট ও চুরির ঘটনা যখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ তখন বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়। তাৎক্ষণিক বিষয়টি সামাল দেন তিনি। আলোচনায় থাকা সারওয়ার আলম বিভিন্ন উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিষয়ে একাধিক উদ্যোগ নেন।
তবে, এর অধিকাংশই আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের সিলেট অংশে জমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ করার ঘোষণা থাকলেও অগ্রগতি ছিল সীমিত। ভূমিকম্পের পর নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ, ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ, জোরপূর্বক মার্কেটে থালা দেওয়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
প্রাথমিক সুরাহা হলেও সাদাপাথর লুটের ঘটনার তদন্ত প্রতিদেন দিতে পারেননি। সাদাপাথর লুট ও চুরির তদন্ত হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে পারেননি।
সিলেটের সচেতন মহল বলছেন, জেলা প্রশাসক বেশ বাড়াবাড়ি করে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা সিলেটের মানুষ শুধু মুখ বুঝে সহ্যই করেছে। এর ফল আজ তাকে ভোগ করতে হলো।
তিন দিনের মাথায় প্রত্যাহার
সিলেটে মাজারের দানবাক্স ও ডেগ সিলগালার মাত্র তিন দিনের মাথায় তাকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এলো। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো ঘোষণা আসেনি।
সিলেটে প্রতিক্রিয়া
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, দায়িত্ব পালনকালে একাধিক আলোচিত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ ঘিরে সারওয়ার আলমের কর্মকাণ্ড নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছিল। সর্বশেষ মাজার ইস্যুতে নেওয়া পদক্ষেপই জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যার পলে শেষ পর্যন্ত তাকে প্রত্যাহার করা হয় বলে ধারণা তাদের।
মাজার-ভক্ত-অনুসারীরা জানান, প্রায় সাতশ বছর ধরে যে প্রক্রিয়ায় মাজার পরিচালিত হয়ে আসছে, সে ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করতেই এই কাজ করা হয়েছে। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দানবাক্সে সিলগালা করা হয়েছে, এটা মোটেও সঠিক পদ্ধতি নয়। এটা মাজার ও অলি-আউলিয়াবিরোধী কর্মকাণ্ড। হিসাব চাইতেই পারেন কেউ। কিন্তু জোর-জবরদস্তি করে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেটা ঠিক নয়।
মাজারভক্ত সোহেল আলী বলেন, ‘শাহজালাল ও শাহপরান মাজার নিয়ে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেছেন। এরই পরিণতিতে তিনি এর ফল পেয়েছেন। মাজারের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশকে অযথা বিতর্কিত করে তোলার কারণে সাধারণ ভক্তদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।’
শাহাজালাল মাজারের এক ভক্ত আব্দুল হান্নান কালবেলাকে বলেন, ‘হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার সিলেটের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। মাজারকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মতামত ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আমরা চাই, মাজারের পরিবেশ, ঐতিহ্য ও ভক্তদের অনুভূতির প্রতি সম্মান রেখে সব কার্যক্রম পরিচালিত হোক।’
সিলেট সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি শামসুল বাসিত শেরো বলেন, ‘কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের মেরামতের মতো সামান্য কাজ দুই বছরে করতে পারেননি জেলা প্রশাসক। দুই বছরের বিদ্যুৎ বিল বাকি, নাইটগার্ডের ১৮ মাসের বেতন বাকি।’
ডিসি সারওয়ার আলম বদলির বিষয়ে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেট শাখার সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম কালবেলাকে বলেন, ‘সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাদাপাথর লুটের সময় তিনি লুটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও পাথর পুনঃস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া র্যাবে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই তিনি জনমনে পরিচিত ছিলেন।’
তবে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নেওয়া কিছু পদক্ষেপ বিশেষ করে দানবাক্স ও ঐতিহাসিক দানের ডেগ সিলগালা এবং সেখানে পুলিশ ও আনসার মোতায়েন অনেকের কাছে বিতর্কিত ও অশোভন মনে হয়েছে।৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের হস্তক্ষেপ জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।’
এতে মাজার সংশ্লিষ্টদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে এবং ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আব্দুল করিম আরও বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হলেও এর পেছনে অন্য কোনো উচ্চপর্যায়ের কারণ রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।’
সিলেট হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগার খাদেম ও ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না শাহজালাল মাজার ইস্যুতে ডিসির বদলি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহই ভালো জানেন।’
চলে যাবেন ডিসি, মঙ্গল দাসের কী হবে?
বিদ্যুতের ২০ হাজার টাকা বিল পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মঙ্গল দাস নামে একজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন সিলেটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ও বিদ্যুৎ আদালতের বিচারক আনোয়ারুল কবির। এরপর থেকে মঙ্গল সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি কারাগার পরিদর্শনের সময় সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মঙ্গলের।
বিষয়টি অবগত হওয়ার পর জেলা প্রশাসক তার জামিনের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। বিদ্যুৎ আদালতের টাকা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পরিশোধের নিশ্চয়তা দিলে সিলেটের বিদ্যুৎ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা ও দায়রা জজ) মঙ্গল দাসকে জামিন দেন। কিন্তু মঙ্গল দাসের বিষয়টি আজও সুরাহা হয়নি। কথা রাখেননি জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম।
ডিসি সারওয়ারকে বহাল রাখার দাবি
সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের আদেশ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সিলেটের সর্বস্তরের যুব সমাজ। রোববার বিকাল ৬টায় সিলেট কোর্ট পয়েন্টে ও ডিসি অফিসের সামনে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তারা বলেন, এ অঞ্চলের স্বার্থে সিলেটবাসীর দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ডিসি সারওয়ার আলমকে বহাল রাখতে হবে। জনমতের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত সিলেটবাসী মেনে নেবে না।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান মো. সারওয়ার আলম। এর আগে তিনি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। সিলেটের সাদাপাথর লুট ও চুরির ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে তখন জেলা প্রশাসক হিসেবে তাকে পদায়ন করা হয়।
"সৌজন্য" কালবেলা




















