বরখাস্ত হয়েও কোটি টাকা আত্মসাৎ, সিলেটের সেটেলমেন্ট কর্মচারীর কাণ্ডে তোলপাড়

  • প্রকাশের সময় : ১৮/০৬/২০২৬ ১২:৫৭:৫১ PM

Share
8

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর প্রতারণা সিন্ডিকেটের তথ্য সামনে এসেছে।


সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের চাকরিচ্যুত (বরখাস্ত) প্রসেস সার্ভেয়ার সুজিত কুমার দে’র বিরুদ্ধে জমি রেকর্ড করে দেওয়ার নামে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। 


সর্বশেষ মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার দুই ভুক্তভোগী টাকা উদ্ধার ও আইনি প্রতিকার চেয়ে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার, ভূমি মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সেনাবাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।


অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত সুজিত কুমার দে (পিতা: শচীন্দ্র কুমার দে, বর্তমান বাসিন্দা: গোপালটিলা আবাসিক এলাকা, টিলাগড়, সিলেট) সরকারি কর্মচারী পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে এই প্রতারণা বাণিজ্য চালিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি এক কর্মকর্তার সাথে অসদাচরণের দায়ে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলেও তার প্রতারণা চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।


সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কাছে দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের সিংহনাদ গ্রামের বাসিন্দা মো: রমজান আলী জানান, ২০২১ সালে একই উপজেলার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে সুজিত কুমার দে’র সাথে তার পরিচয় হয়। মাইজগাঁও মৌজার নিজস্ব জমি রেকর্ড করতে না পারার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সুজিত নিজেকে সেটেলমেন্ট অফিসের প্রভাবশালী কর্মী দাবি করে কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেয়।


প্রাথমিকভাবে ৩ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে কাজ শেষের কথা বলে কয়েক ধাপে সর্বমোট ৮ লাখ ৮২ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় সুজিত। বিশ্বাস অর্জনের জন্য সুজিত তার বাসায় অফিসের ভুয়া কর্মকর্তা সাজিয়ে দালালদের মাধ্যমে ভুক্তভোগী রমজান আলীর সাথে বৈঠকও করায়। কিন্তু দীর্ঘ চার বছর পার হলেও কোনো কাজ হয়নি। পরবর্তীতে রমজান আলী জোনাল অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তার মৌজার ফাইল অনেক আগেই ডিসি অফিসে পাঠানো হয়েছে এবং সুজিতের পুরো প্রক্রিয়াই ছিল একটি ফাঁদ। বর্তমানে টাকা ফেরত চাইলে সুজিত ফোন বন্ধ করে রাখছে এবং ধরাছোঁয়া এড়াতে ঘন ঘন বাসা পরিবর্তন করছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।


এদিকে, কুলাউড়ার রাজনগর মৌজার আরেক দরিদ্র দিনমজুরের জমি সংশোধনের নামে ৯০ হাজার টাকা আত্মসাতের আরেকটি ভয়াবহ তথ্য মিলেছে। জীবিকার তাগিদে ওই দিনমজুর মাঠে জরিপের সময় ঢাকায় থাকায় তার পৈত্রিক জমি অন্য নামে রেকর্ড হয়ে যায়। আলমপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে তিনি সুজিতের খপ্পরে পড়েন। সুজিত ‘আপিল অফিসারের’ মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওই দিনমজুরের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।


এই ঘটনার অভিযোগে আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট রাজনগর মৌজার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাগজপত্র ও নথি অফিসের পরিবর্তে এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাসায় রাখা ছিল, যেখানে সুজিত ও প্রতিপক্ষের লোকজনের রহস্যজনক যাতায়াত ছিল। সরকারি নথি কেন অফিসের বাইরে ব্যক্তিগত বাসায় রাখা হলো—তা নিয়ে এখন তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। টাকা ফেরত চাইলে উল্টো ভুক্তভোগীকে গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।


ভুক্তভোগীরা জানান, তারা সরল বিশ্বাসে এবং প্রশাসনের ওপর অন্ধ আস্থা রেখে টাকা লেনদেনের সময় কোনো লিখিত রসিদ রাখেননি। সুজিত তাদের এই চরম দুর্বলতাকেই পুঁজি করেছে। রমজান আলী ও ভুক্তভোগী দিনমজুর তাদের কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধার এবং এই জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।


সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সাবেক প্রসেস সার্ভেয়ার সুজিত কুমার দে’র ব্যক্তিগত মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। 


তবে ভূমি প্রশাসনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে সুষ্ঠু তদন্ত হলে কুলাউড়া ও আলমপুর সেটেলমেন্ট অফিসের ভেতরের আরও অনেক অপ্রকাশিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বড় সিন্ডিকেট উন্মোচিত হতে পারে।


সিলেট প্রেস / aa


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-১৮ ১২:৫৭:৫১