সকাল থেকেই কড়া রোদ ছিল সুনামগঞ্জে। গেল দশদিনেরও বেশি সময় ধরে এভাবে কড়া রোদের দেখা পান নি এই জেলার কৃষকরা। বুধবার বিকাল সাড়ে তিনটায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন দেখে দেখার হাওরপাড়ে রীতিমত দৌড়াদৌড়ি। কেউ ধান সামলানোর চেষ্টা করছিলেন, কেউবা পচা খড়ও সামলানোর চেষ্টা করেছেন। ধানের সঙ্গে খড় সামলানোর ব্যস্ততা দেখে প্রশ্ন ছিল, ধানই সামলাতে পারছেন না, খড় নিয়ে টানাটানি করছেন যে, কাজে ব্যস্ত কৃষাণী জমিলা খাতুন উত্তরে বললেন, ‘গরু কী ধান খাবে, গরু বাঁচাইতে অইবো না, সারা বছর কী খাওয়াইবো এই দুশ্চিন্তায় এমনিতেই গরু নিয়া বেছের (বিক্রয় করছে) সকলে (সবাই)।
দেখার হাওরপাড়ের ইসলামপুর গ্রামের সামনের সড়কে দীর্ঘ সারিতে পচা ধান শুকানোর কাজ করছিলেন কৃষক- কৃষাণীরা। তাদেরই একজন মাসুক মিয়া। সড়কের স্লোপে পচা খড় শুকাচ্ছিলেন তিনি। তার স্ত্রী সালামা বেগম একই সড়কের উপরে ধান শুকাচ্ছিলেন। বললেন, এক একর ৫৬ শতক জমির মধ্যে এক একর কাটতে পারছি। খড় সব পচি গেছে। গরু ছিল ৬ টা, ৬০ হাজার টাকার গরু, ৪০ হাজার টাকায় বিক্রয় করেছি। বাকী চারটাও বিক্রয় করে ফেলবো। না হয় খাওয়াবো কী?
এর পাশেই আব্দুল অদুদ নামের একই গ্রামের আরেক কৃষক তার স্ত্রীকে নিয়ে এভাবে দুই কাজই করছিলেন। বললেন, চার একর জমির মধ্যে তিন একর ২৮ শতাংশ কেটে এনেছি। খড় পচে কাদা-গোবরের মত হয়ে গেছে। নয়টা গরু ছিল, দুই লাখ টাকার চারটা গরু এক লাখ টাকায় বিক্রয় করেছি। এখনো টাকা পাই নি। পরে দেবে টাকা। বাকী ৫ টা দেখি আল্লায় কী করেন।
গ্রামের ইসলাম উদ্দিন পচা খড় একটি শাড়ি দিয়ে বেঁধে বাড়ি নিচ্ছিলেন। বললেন, ৩ একর জমির মধ্যে এক একর ২৮ শতাংশ ডুবেছে। খড়ের অবস্থা দেখছেনই তো। এই খড় গরুও খাবে না। তবুও নিচ্ছি। কিছুই না পেলে হয়তো খেতেও পারে। নব্বই হাজার টাকা দামের তিন গরু ৬০ হাজার টাকায় বিক্রয় করেছি। আমি কেবল নয়, হাজারো গৃহস্থের একই অবস্থা।
ইসলামপুরের পাশেই দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা উন্নয়নকর্মী শাহ্ কামাল বললেন, ‘আমরা যখন ওখানে কাজ করছিলাম অনেক কৃষকই বলেছেন, গরু বাঁচানো যাবে না। নিজের জীবন বাঁচানোই কষ্ট হয়ে পড়বে। গরু রাখলে খাওয়াবো কী।
তিনি জানালেন, পরের বছর কীভাবে চাষাবাস করবেন, এমন প্রশ্ন করলে কেউ বলেছেন ঋণ করে গরু কিনবেন, কেউ বলেছেন পরের বছরেরটা পরের বছর দেখা যাবে। অথচ চাষাবাসের সঙ্গে গরু অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আবার গরু কৃষকরা লালন-পালন করেন লাভের আশায়, কিন্তু এবার এখানেও আর্থিক ধাক্কা খেয়েছেন কৃষক-কৃষাণীরা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে কেবল এই দৃশ্য নয়। জেলার অন্যান্য উপজেলার হাওরপাড়েও এই দুর্যোগ আছে।
মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল বাশার বললেন, হাওরপাড়ের গ্রামগুলোর কৃষকদের কেউ চলমান খরচ মেটানোর জন্য কেউবা সারা বছর ১০-১৫ টা করে গরুকে কী খাওয়াবেন, এই দুশ্চিন্তায় নৌকা বোঝাই করে গরু নিয়ে বাজারে বিক্রয় করছেন। তিনি জানালেন, তাঁর জানা মতে মধ্যনগর গ্রামের গফুর চানের ছেলে শামীম সাইলানি গ্রামের ইসলাম উদ্দিনের ছেলে মুখলেস দুইদিন আগে অপেক্ষাকৃত কম দামেই গরু বিক্রয় করে দিয়েছেন।
শাল্লার বড় কৃষক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়া বললেন, ছোট-বড় সকল কৃষককে বলেছি এবার গরু পালন দায়। এখনই খাবার নাই। গরুকে ঠিকমত না খাওয়াতে পারলে ওজন কমে যাবে, হাড্ডিসার হয়ে পড়বে। দামও কম পাওয়া যাবে। এখনই বিক্রয় করতে পারলে কিছুটা দাম পাবে। পরের বছরেরটা পরে দেখা যাবে। আপাতত বাঁচুক প্রান্তিক কৃষকরা।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম অবশ্য বলেছেন ভিন্নকথা। তিনি বললেন, ২০ দিন পরে কোরবানির ঈদ, আমাদের হিসেব অনুযায়ী ৫০ হাজার গরু মোটাতাজা করে বিক্রয়ের জন্য রেখেছে কৃষক। এখন তারা এগুলো আগে-ভাগেই বিক্রয় করে দিচ্ছে। এখনোই কোথাও গরুর খাবার সংকট দেখা দেয় নি। দাম বেশি পাবার আশায় কেউ কেউ বাকীতে এখন গরু বিক্রয় করছে জানিয়ে তিনি বললেন, জেলার ১২ উপজেলায় তাদের হিসেব অনুযায়ী পাঁচ লাখ ৪০ হাজার গবাধিপশু রয়েছে।




















