বিশ্বম্ভরপুরে ধান কাটার আনন্দে বাগড়া বেহাল সড়কের

  • প্রকাশের সময় : ২৭/০৪/২০২৬ ০৩:৩৮:০১ PM

Share
24

কষ্টে ফলানো পাকা বোরো ধান কাটার আনন্দ ছিল কৃষকের মনে। কিন্তু সেই আনন্দে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেহাল সড়ক। কাটা ধান পরিবহনে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার হাওরাঞ্চলের কৃষকদের। 

কৃষকরা জানান, হাওরের গভীর থেকে কাটা ধানের আঁটি খলায় (ধান মাড়ানো ও শুকানোর জন্য খোলা জায়গা) নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত কাঁচা সড়ক একেতো ভাঙা, তার ওপর বৃষ্টিতে ভিজে বেহাল।

এ অবস্থায় সড়ক দিয়ে ধান পরিবহনের জন্য কোনো যান চলাচল করতে পারছে না। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। অনেকের ধান মাঠেই পচে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নয়, জেলার প্রত্যেক  উপজেলার হাওরের ভেতর সড়ক পাকা না হওয়ায় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে কৃষকরা।

 

বিশ্বম্ভরপুরের ফতেপুর ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা ও শনির হাওরপারের কৃষক শফিউল আলম বলেন, আমাদের কষ্টের কথা কেউ শোনে না। কষ্টে ফলানো বোরো ধানের চারা রোপণ করা থেকে শুরু করে পাকা ধান কেটে তা খলায় আনতে গিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে হাজার হাজার কৃষক। তাই ধান খলায় তোলার জন্য সড়ক পাকা করা দরকার। 
  
কৃষক শফিউল জানান, হাওরের গভীর থেকে ধান কেটে আনার সময় ভাঙাচোরা সড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেকের হাত-পা ভাঙে।

অনেক সময় মাটির সড়কে যানবাহন আটক থাকে দিনভর। শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। বৈরী আবহাওয়ার কারণে যে শ্রমিক ও ট্রলি পাওয়া যায়, তাদের মজুরি দিতে হয় বেশি,  নিজেকেও কষ্ট করতে হয়। কিন্তু লাভের অংশে ভাগ বসাচ্ছে দুর্যোগ আর দুর্ভোগ। সড়ক পাকা করা হলে এত সমস্যা হতো না।

শনির হাওরের আরেক কৃষক লতিফুর রহমান জানান, মাটির সড়ক পাকা না হওয়ায় বৃষ্টিতে কাদা ও সড়ক পিছলা হওয়ায় মাথায় করে ধান নিয়ে পায়ে হাঁটাই দায় হয়ে পড়েছে। কোনো গাড়ি এই সড়ক দিয়ে গেলে চাকা সামনের দিকে এগোয় না। পিছলে সড়ক থেকে নিচে নেমে যায়। তিনি বলেন, জমি করে লাভ হওয়ার কথা, এখন লাভের পরিবর্তে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। হাওরের গভীর থেকে খলায় পরিবহনের জন্য পাকা সড়ক না করলে আমাদের দুর্ভোগের শেষ থাকবে না।

উপজেলার খরচার হাওর, আঙ্গারউলি হাওর শনির হাওরসহ কয়েকটি হাওরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাওরের গভীর থেকে পাকা ধান কেটে সড়কের পাশে রাখা হয়। পরে হাওরের সড়ক দিয়ে সেই ধান বাড়িতে ও খলায় নিয়ে যাওয়ার সড়ক কাঁচা হওয়ায় বৃষ্টি হলে অটোরিকশা, ঠেলাগাড়ি, পিকআপ ভ্যান, ট্রলিসহ কোনো  যানবাহন চলতে পারছে না। এসব যানবাহন দিয়ে ধান পরিবহন করার সময় মাটির সড়কের কাদা ও গর্তে আটকে গেলে দিন পার হয়ে যায়। তাই হাওরের কাঁচা সড়ক পাকা করার জন্য দায়িত্বশীলদের কাছে দাবি জানিয়েও কোনো প্রতিকার মিলছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর বোরো জমিতে গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ধান উৎপাদন করা হয়। এই ধান রক্ষায় সরকার গত ৯ বছরে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে চলতি বছর বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামত ও সংস্কারে ২৩টি পিআইসিতে চার কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ উপজেলায় সাত  হাজার ছয় হেক্টরের বেশি জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এতে ৪১ হাজার ৩৯৯ মেট্রিক টনের বেশি ধান উৎপাদিত হবে, যার বাজার মূল্য ১১৫ কোটি টাকার বেশি।

শেখ দেলোয়ার হোসেনসহ হাওরপাড়ের সচেতন মহলের বক্তব্য, প্রতিবছর শত কোটি টাকা ব্যয়ে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হলেও ধান পরিবহনের জন্য হাওরের সড়কগুলো মেরামত বা পাকা করার জন্য কোনো বরাদ্দ হয় না। এ জন্য পদক্ষেপও নেন না দায়িত্বশীলরা। হাওরপাড়ের কৃষি রক্ষায় ও কৃষকদের স্বার্থে দ্রুত এর সমাধানের দাবি জানান তিনি। 

কৃষক সাইদ আহমেদ জানান, হাওরের জাঙ্গাল (সড়ক) নিয়ে বংশপরম্পরায় দুর্ভোগের শিকার হলেও কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। বৈশাখের এই সময় যেখানে আনন্দ করার কথা, সেখানে স্থবিরতা  দেখা দিয়েছে। এর থেকে মুক্তির জন্য জনপ্রতিনিধিসহ দায়িত্বশীল কর্তৃক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও সুফল পাচ্ছি না। ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে। সেই সঙ্গে পরিবহনে শারীরিক কষ্টও হচ্ছে। 

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, বৃষ্টি হলে হাওরের সড়ক দিয়ে চলাচল করা কঠিন। ইউনিয়ন পরিষদের টিআর কাবিটা থেকে সড়ক মেরামত করা হয়। কিন্তু সড়ক পাকা না হলে দুর্ভোগ থেকে কৃষকদের মুক্তি মিলবে না।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা সড়ক মেরামত ও পাকা করতে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছেন। 

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন খান বলেন, এ বছর বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় সড়কগুলো বেশি খারাপ হয়।  কিছু মেরামতও করা হয়েছে। আর কৃষকদের সুবিধার জন্য সড়ক পাকা করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স

প্রকাশ: ২০২৬-০৪-২৭ ১৫:৩৮:০১