বিশ্বের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের হাওরবেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জ। অথচ বজ্রপাত নিরোধে সুবিস্তৃত এই হাওরাঞ্চলে নেই কার্যকর উদ্যোগ। যার কারণে জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
২০২৩ সালে কোটি টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জের ছয়টি উপজেলায় ১৮টি বজ্রনিরোধক যন্ত্র স্থাপন করা হয়। তবে সেগুলো আজ পর্যন্ত বজ্রপাত প্রতিরোধ করেছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যার পরিপ্রেক্ষিতে এসব যন্ত্র নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে সন্দেহ বেড়েই চলেছে।
হাওরপাড়ের বাসিন্দারা বলেছেন, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের সময় স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের কথা চিন্তা করে করা হয়নি। এমনকি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে কোনো আলোচনা করেনি সংশ্লিষ্টরা। যার কারণে এলাকা হিসেবে যে পরিমাণ যন্ত্র স্থাপন করার কথা, সেটা করা হয়নি। যেগুলো স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোও কাজ করছে না ঠিকমতো।
হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলায় বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত এখন এক প্রাণঘাতী আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে বোরো ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে নিহতের ঘটনা প্রতিবছরই বাড়ছে। সরকারি হিসাবে চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত গেল চার বছরের (২০২২-২৬) হিসাবে এই অঞ্চলে ৬৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে বজ্রপাতে। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা আরও বেশি।
বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণার পর সুনামগঞ্জে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করার প্রকল্প নেয় সরকার। দিন দিন হাওরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২০২৩ সালে জেলার ছয়টি উপজেলায় ১৮টি বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়। এগুলোর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় চার, তাহিরপুরে তিন, বিশ্বম্ভরপুরে তিন, জামালগঞ্জে তিন, ধর্মপাশায় তিন ও শাল্লায় দুটি দণ্ড স্থাপন করা হয়। প্রতিটি দণ্ডের জন্য ব্যয় হয় ছয় লাখ টাকা।
জানানো হয়, প্রতিটি দণ্ডের আশপাশের একশ বর্গমিটারের (বৃত্তের মধ্যে) ভেতরে বজ্রপাত সংঘটিত হলে তা টেনে এনে মাটিতে পাঠিয়ে দেবে দণ্ডের মাথায় লাগানো লাইটিং অ্যারেস্টার নামক যন্ত্র। শুধু প্রতিরোধ নয়, বছরে ওই স্থানে কতটি বজ্রপাত হয়েছে তা গণনা করে রাখবে তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত যন্ত্রটি। তবে স্থাপনের দুই বছর পরও ওই দণ্ডগুলো জানান দেয়নি তার আশপাশে কোনো বজ্রপাত হয়েছে কিনা। বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো সচল না অচল, তাও জানে না কর্তৃপক্ষ।
তাহিরপুরের বিএনপি নেতা মাহবুব মল্লিক বলেন, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখায় তাহিরপুরে তিনটি দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মাটিয়ান হাওরে কোনো দণ্ডই স্থাপন হয়নি। দুটি করে বসানো হয়েছে শনির হাওর এবং তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। স্থান নির্বাচনে ভুল হয়েছে বলে মনে করেন মাহবুব মল্লিক। হাওরের মাঝখানে স্থাপন হলে এই দণ্ডগুলো কিছু কাজে লাগত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও হাওরের মাঝখানে অর্থাৎ দূরবর্তী এলাকায় বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়নি। যার কারণে হাওরের সর্বত্রই রয়ে গেছে ঝুঁকি।
বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন সময়ে প্রকল্পের প্রকৌশলী সালাহ উদ্দিন জানিয়েছিলেন, সুনামগঞ্জে লাইটেনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো ৩০০ ফুট এলাকাজুড়ে বজ্রপাত প্রতিহত করে তা মাটিতে পাঠিয়ে দেবে। একই সঙ্গে ওই স্থানে মোট কতটি বজ্রপাত হয়েছে, তা হিসাব করে রাখবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমেও ২০২৩ সালে হাওরে ৪০০ বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, বজ্রপাত নিরোধের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তা আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাসিবুল হাসান বলেন, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের পর থেকে বর্ষা মৌসুম শেষে সেগুলোর কার্যকারিতা দেখা হয়। গেল মৌসুম পর্যন্ত এই দণ্ডগুলোর কাউন্ট শূন্য ছিল বলে জানান তিনি। তিনি দাবি করলেন, যেখানে জনসমাগম বেশি, এগুলো সেখানে স্থাপন করা হয়েছিল।




















