চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে সামাজিক সংকট

সিলেটে ৫ লাখ মাদকসেবী, নেই সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্র

  • প্রকাশের সময় : ২৬/০৬/২০২৬ ০৫:৩০:২৭ PM

বেসরবকারি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা ব্যয়বহুল

Share
1

“স্যার, আমার ছেলেরে পাওয়ারি (উচ্চ মাত্রার) ঘুমের ওষুধ দেন। যাতে সারাদিন বাসায় ঘুমিয়ে থাকে। বাইরে গেলেই নেশা করে, ঘরে-বাইরে অশান্তি সৃষ্টি করে।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন এক বৃদ্ধা মা। মাদকাসক্ত ছেলেকে নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন সিলেটের এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে। ছেলেটি ইয়াবা, গাঁজা ও মদে আসক্ত। এর আগের সাক্ষাতে চিকিৎসক তাকে একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা করানোর আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় অসহায় মা চিকিৎসকের কাছে ছেলেকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে বাসায় রাখার আকুতি জানান।

গত মঙ্গলবার সিলেট নগরের একটি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে দেখা মেলে এমনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। আর এই দৃশ্যই যেন সিলেটের সামগ্রিক মাদক পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি।

সাম্প্রতিক এক জাতীয় সমীক্ষা বলছে, সিলেট বিভাগে প্রায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করেন, যা বিভাগের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। তবে বাস্তবে মাদকসেবীর সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি বলে মনে করছেন অনেকে। অথচ এই বিপুলসংখ্যক মাদকসেবীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সিলেটে নেই কোনো সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে সিলেট জেলায় মাত্র ৭টি। এসব কেন্দ্রে মোট শয্যা সংখ্যা ৮০টি। অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে, আহ্বান মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, এইম ইন লাইফ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, প্রত্যাশা ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, প্রতিশ্রুতি, নিউ প্রশান্তি, নিউ প্রেরণা, বাঁধন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। এছাড়া, মৌলভীবাজার জেলায় আদর মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ও হেভেন মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, হবিগঞ্জে সূর্য মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ও  নিউ স্পন্দন মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, সুনামগঞ্জে বাঁধন-সুনামগঞ্জ মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। যেগুলোতে ১০টি করে মোট ৬০টি শয্যা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় পাঁচ লাখ মাদক ব্যবহারকারীর বিপরীতে ১৪০ শয্যার এই ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।  চিকিৎসার সময়সীমার উপর নির্ভর করে ব্যয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

এদিকে, প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ জানান দেশে ৮২ লাখ মাদক ব্যবহারকারী রয়েছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) পরিচালিত এক যৌথ জাতীয় সমীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ জন, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করেন। তবে এই হিসাবে সিগারেট সেবনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

গবেষণাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড ((আরএমসিএল) যৌথভাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে গবেষণা কার্যক্রমটি সম্পন্ন করে। গবেষণায় নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড (এনসিইউএম) ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সিলেটে (৪.২৮%) ময়মনসিংহ (৬.০২%), রংপুর (৬.০০%) ও চট্টগ্রাম (৫.৫০%) বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, রাজশাহী (২.৭২%) ও খুলনা (৪.০৮%) বিভাগে তুলনামূলকভাবে কম হার লক্ষ্য করা গেছে।

সংখ্যার বিচারে সর্বাধিক মাদক ব্যবহারকারী বসবাস করছে ঢাকা বিভাগে (প্রায় ২২.৯ লাখ), এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (১৮.৮ লাখ) ও রংপুর বিভাগ (প্রায় ১০.৮ লাখ)।

বিভাগভিত্তিক মাদক ব্যবহারকারীর আনুমানিক সংখ্যা বরিশাল ৪ লাখ ৪ হাজার ১১৮ জন, চট্টগ্রাম ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন, ঢাকা ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন, খুলনা ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০ জন, ময়মনসিংহ ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন, রাজশাহী ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৯ জন, রংপুর ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন এবং সিলেট ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন। সমগ্র দেশ (যেকোনো ধরনের মাদক ব্যবহারকারী) ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ জন।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। প্রায় ৬১ লাখ মানুষ গাঁজা ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন, যার ব্যবহারকারী প্রায় ২৩ লাখ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অ্যালকোহল, যার ব্যবহারকারী প্রায় ২০ লাখ। এ ছাড়া কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ এবং হেরোইনের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন, যা এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

মাদকের ভয়াল থাবায় তরুণরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাদকসেবীদের বড় অংশই তরুণ। প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করে। অন্যদিকে ৫৯ শতাংশ মানুষ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম মাদক সেবন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সিলেটে মাদকের সহজলভ্যতা তুলনামূলক বেশি। ফলে তরুণদের একটি বড় অংশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে।

মাদকাসক্তি একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ হলেও দেশে চিকিৎসা সুবিধা অত্যন্ত সীমিত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সমীক্ষা অনুযায়ী, মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী জীবনের কোনো পর্যায়ে চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন।

সিলেটে বর্তমানে কোনো সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নেই। সরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্ত রোগীরা মূলত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও ডিটক্সিফিকেশন সেবা পান। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য রোগীদের ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে যেতে হয়।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, একজন মাদকসেবী গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৬ হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের বিস্তার তরুণদের জীবন ধ্বংস করার পাশাপাশি পারিবারিক অশান্তি, অপরাধপ্রবণতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক চোরাচালান ও বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। অর্থ পাচারের এই খাতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম।

মনোরোগ, মানসিক ও ¯স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোপী কান্ত রায় বলেন, ‘মাদকাসক্তিকে অপরাধ নয়, একটি জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সিলেটে দ্রুত একটি সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাউন্সেলিং সেবা সম্প্রসারণ এবং তরুণদের জন্য প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান পাটওয়ারীর মুঠোফোনে কল দিলে তিনি কল রিসিভ করেননি।


সিলেট প্রেস / এফ কে/ জালালাবাদ


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-২৬ ১৭:৩০:২৭