‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছো দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।’ বর্ষা মৌসুমে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এভাবেই দৃষ্টিনন্দন কদম ফুলকে নিয়ে গভীর অনুভূতিসম্পন্ন আবেগের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে গেছেন।
বাংলাদেশ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি, সে কথা বলাই বাহুল্য। ষড়ঋতুর মধ্যে ‘বর্ষা’ এক অনন্য ঋতু।
আর বর্ষার আগমনকে স্বাগত জানাতে কদম ফুল যেন সর্বদা প্রস্তুত। গাছে গাছে তার বর্ণনাতীত অপূর্ব শোভা।
পাতার আড়ালে মুখ লুকিয়ে যেন হাসছে কদম, অপরূপ সেই দৃশ্য। তবে শুধু বর্ষাকালেই নয়, আগাম বর্ষা অর্থাৎ বর্ষাকাল আসার আগেই বৃত্তাকার কদম ফুল প্রকৃতিতে তার অগ্রিম শোভা ছড়িয়ে দেয়, যা দেখে নিমেষেই জুড়িয়ে যায় চোখ।
কদম ফুলের ইংরেজি নাম Burflower Tree এবং বৈজ্ঞানিক নাম Anthocephalus indicus। বর্ষার মেঘের সঙ্গে মিতালী বলেই এর আরেক নাম মেঘাগমপ্রিয়। নারীর সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করে অনেকেই একে ‘ললনাপ্রিয়’ও বলেন। এ ছাড়া স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন নামেও কদমের পরিচিতি রয়েছে। বৃত্তপুষ্প, কর্ণপূরক, ভৃঙ্গবল্লভ, মঞ্জুকেশিনী, পুলকি, সর্ষপ, প্রাবৃষ্য, সুরভি, সিন্ধুপুষ্প, এসবই কদমের ভিন্ন ভিন্ন নাম।
এর সংস্কৃত নাম ‘কদম্ব’। কদম্ব মানে হলো ‘যা বিরহীকে দুঃখী করে’। প্রাচীন সাহিত্যের একটি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে কদম ফুল। মধ্যযুগের বৈষ্ণব সাহিত্যজুড়ে রয়েছে কদমের সুরভী মাখা রাধা-কৃষ্ণের বিরহগাথা।
গোলাকার সাদা-হলুদ রঙে মিশ্রিত ফুলটি দেখতে যেন ভোরের উষা। রূপসী তরুর অন্যতম রূপবতী হলো কদম ফুল। কদম ফুলের সৌন্দর্যে বিমোহিত হন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। একই সঙ্গে বর্ষার প্রকৃতি বাংলা সাহিত্যে এনে দিয়েছে স্নিগ্ধতা। বর্ষার উপহার সোনালি রঙের কদম ফুল নিয়ে রচিত হয়েছে নানা গল্প, উপন্যাস, কবিতা আর গান।
বর্ষাকালের বাহারি এবং ব্যতিক্রমী ফুল কদম। এই ফুলটি তো সবারই চেনা-জানা। গাছে গাছে সবুজ পাতার ডালে গোলাকার মাংসল পুষ্পাধার, আর তার থেকে বের হওয়া সরু হলুদ পাপড়ির মুখে সাদা অংশ কদমকে সাজিয়ে তুলেছে ভিন্নভাবে। গোলাকার হলুদ-সাদা মিশ্রিত ফুলটি দেখতে যেন ভোরের উষা।
আষাঢ়ের বাদলের দিনে হৃদয়মোহিনী কদম ফুলের আগমন ঘটে। তাই বৃষ্টির অবিরাম বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসে কদম ফুলের রেণুর মিষ্টি সুবাস। কদম আর বর্ষা যেন একে অপরকে আলিঙ্গন করে রয়েছে বহুকাল ধরে। কদম ছাড়া বর্ষা যেন একেবারেই বেমানান। এ জন্য কদম ফুলকে বলা হয় ‘বর্ষার দূত’।
কদম ফুল দেখতে বলের মতো গোলাকার। কদমের একটি পূর্ণমঞ্জরীকে সাধারণত একটি ফুল মনে করা হলেও এটি অজস্র ফুলের সমাহার। এর একটি মঞ্জরীতে প্রায় আট হাজার ফুল বিন্যস্ত থাকে। কদম ফুল দেখতে বলের মতো গোল, মাংসল পুষ্পাধারে অজস্র সরু সরু ফুলের বিকীর্ণ বিন্যাস।
শিল্প-সাহিত্যের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে কদম ফুলের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। কদম ফুল বর্ষার দূত। জ্যৈষ্ঠের শেষে আষাঢ়ের শুরুতে কদম ফুল ফোটে। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে কদম গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে। কদম ফুলের মৌমৌ গন্ধে আর দৃষ্টিনন্দন রূপ সবার নজর কাড়ছে। বর্ষার অনুভূতি ও অপরূপ সৌন্দর্যের দাবিদার কদম ফুল।
শুধু সৌন্দর্য নয়, বন্যপ্রাণীর প্রয়োজনীয় খাদ্য হিসেবেও এর অসীম গুরুত্ব রয়েছে। কদম ফুলে পাপড়ি ঝরে গেলে গোলাকার বলের মতো দেখা যাওয়া মাংসল অংশটি বাদুড়, কাঠবিড়ালি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর অন্যতম প্রিয় খাবার।
কদম গাছ দীর্ঘাকৃতি এবং বহুশাখাবিশিষ্ট। এই গাছের উচ্চতা ৪০–৫০ ফুট পর্যন্ত হয়। শীতে কদমের পাতা ঝরে এবং বসন্তে কচি পাতা গজায়। সাধারণত পরিণত পাতার তুলনায় কচি পাতা অনেক বড়। কদমের কচি পাতার রঙ হালকা সবুজ। কদমের একটি পূর্ণ মঞ্জরীকে সাধারণত একটি ফুল বলেই মনে করা হয়।
কয়েক বছর আগেও আষাঢ়ের কদম গাছ ফুলে ফুলে ভরে থাকত। কদম ফুলের নয়নাভিরাম দৃশ্য ফুলপিপাসুদের তৃপ্তি দিত। তরুণ-তরুণীরা কদম ফুল প্রিয়জনকে উপহার দিত, মেয়েরা খোঁপায় পরত, শিশুরা খেলায় মেতে উঠত। কিন্তু আজ এসব দৃশ্য অতীত।
কদম গাছ কমে যাওয়ায় এখন মানুষ তার নিজস্ব সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য ভুলতে বসেছে। তবে কী কালের বিবর্তনে বাংলার প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে চোখজুড়ানো কদম ফুল?



















