ইউরোপের সপ্ন: সিলেটে ফেসবুকে ভিসা প্রাপ্তির ভূয়া ভিডিও ছড়িয়ে বিভিন্ন এজেন্সির প্রতারণা

  • প্রকাশের সময় : ১৮/০৫/২০২৬ ০৩:৩৭:৩৮ PM

সিলেট নগরীর অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস থেকে ফেসবুকের মাধ্যমে ভিসা প্রাপ্তির ভূয়া ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে।

Share
43

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন এখন অনেক পরিবারের কাছে সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক। সেই স্বপ্নকে পুঁজি করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য চটকদার ভিডিও। কোথাও দেখা যায় সপরিবারে ইউরোপের ভিসা হাতে হাস্যোজ্জ্বল মানুষ, কোথাও আবার বিদেশযাত্রার ‘সফলতার গল্প’। ভিডিওগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যাতে সহজেই বিশ্বাস জন্মায়।

কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়ংকর প্রতারণার চিত্র। ভিডিওতে যাদের ভিসাপ্রাপ্ত পরিবার হিসেবে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তারা কেউই প্রকৃত পরিবার নয়। এমনকি তাদের কারও ইউরোপের ভিসাও হয়নি। সামান্য টাকার বিনিময়ে সাধারণ মানুষকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে সাজানো হচ্ছে ভুয়া সফলতার গল্প। আর সেই ভিডিও ব্যবহার করেই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে হাজারও মানুষকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রতারণার জাল ছড়িয়ে পড়েছে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ পর্যন্ত। যার মূল কেন্দ্র বিভাগীয় শহর সিলেট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কয়েকটি ভিডিও সূত্র ধরেই অনুসন্ধান শুরু করা হয়।

ভিডিওগুলো পাওয়া যায় অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি কথিত ভিসা এজেন্সির ফেসবুক পেজে। সেখানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সিইও ইমন উদ্দিন কয়েকটি পরিবারের হাতে কানাডা, পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসা তুলে দিচ্ছেন।

দুটি ভিডিওর সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা যায় । ভিডিও দুটিতে দেখানো পাঁচজনের বাড়িই হবিগঞ্জ সদর উপজেলার আব্দাবখাই গ্রামে। প্রথম ভিডিওতে স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানের কানাডার ভিসা পাওয়ার দাবি করা হয়। আর দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখানো হয় শুধু স্বামী-স্ত্রীকে।

ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রথম ভিডিওতে পরিবারের কর্তা হিসেবে যাকে দেখানো হয়েছে, তার নাম সানু মিয়া। তবে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।

গ্রামবাসী জানান, সানু মিয়া সিলেটে আনসার-ভিডিপিতে চাকরি করেন। সেই সূত্রে তিনি বর্তমানে সিলেটে অবস্থান করছেন। তবে ভিডিওতে থাকা নারী ও যুবক তার পরিবারের কেউ না বলে নিশ্চিত করেন গ্রামের কয়েকজন। ভিডিওতে তার ছেলে হিসেবে যাকে দেখানো হয়েছে, তাকে খুঁজে বের করা হয়। ১৮ বছরের ওই যুবকের নাম আরিফ মিয়া আশরাফ। তিনি আব্দাবখাই গ্রামের সালাহউদ্দিনের ছেলে।

আরিফ মিয়া আশরাফ জানান, মাত্র ১ হাজার টাকা ও একটি বিরিয়ানির প্যাকেটের বিনিময়ে তাকে অভিনয় করতে নেওয়া হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, এই এলাকার আরও অনেককেই অভিনয়ের জন্য নিয়ে গেছে সানু মিয়া ও তার ভাতিজা এনামুল হক এবং নাজমুল মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার বিদেশে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই। তারা বলেছিল শুধু বসে থাকতে হবে, তাহলে ১ হাজার টাকা দেবে। না বুঝেই সেখানে গিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখানো হয়, স্বামী-স্ত্রী ভিজিট ভিসায় কানাডা যাচ্ছেন। তাদের হাতে ভিসার কাগজপত্র তুলে দেওয়ার দৃশ্যও রয়েছে। তবে সেখানে রাসেল নামে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম তারেক আহমেদ। পেশায় তিনি দিনমজুর। ভিডিওতে যাকে তার স্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে, তিনি আসলে তার প্রতিবেশী এবং সম্পর্কে খালা। তাদের দুজনের বাড়িই আব্দাবখাই গ্রামে।

তারেক আহমেদ বলেন আমাকে এনামুল হক সিলেটের একটি এজেন্সিতে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে অভিনয় করিয়ে ১ হাজার টাকা দিয়েছে। আমি তো জানতাম না এগুলো মিথ্যা আর প্রতারণা। জানলে কোনো দিনই যেতাম না।

তারেকের স্ত্রী হিসেবে দেখানো ওই নারী বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল চাকরির জন্য একটা ইন্টারভিউ দিতে হবে। তাই সিলেট গিয়েছিলাম। আমরা তো জানতাম না তারা প্রতারক। পরে আসার সময় ১ হাজার টাকা দেয়। আমাকে সিলেট নিয়ে গিয়েছিল এনামুল।’

ভিডিওতে থাকা প্রত্যেকেই জানান, তারা এনামুলের মাধ্যমেই সিলেট গিয়েছেন। সেই সূত্র ধরে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য এনামুলের ভূমিকা। তিনি মাঠপর্যায়ে লোক সংগ্রহ করতেন অভিনয়ের জন্য।

এনামুলের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার বাবা নানু মিয়া জানান, এনামুল হবিগঞ্জ শহরে থেকে লেখাপড়া করেন। প্রতারণার কথা জানতে চাইলে প্রথমে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পরে বলেন, আমি আপনার সঙ্গে আলাদা দেখা করব।

এদিকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এনামুলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন কেটে দেন।

এমন ভুয়া ভিডিও ব্যবহার করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করছে ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তারা টার্গেট করছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। কেউ জমি বিক্রি করছেন, কেউ ঋণ নিচ্ছেন, আবার কেউ ধারদেনা করে লাখ লাখ টাকা তুলে দিচ্ছেন এই চক্রের হাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকের ভাগ্যে জোটে প্রতারণা, অনিশ্চয়তা আর সর্বস্ব হারানোর বেদনা।

এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে উঠে আসে ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’-এর সিইও ইমন উদ্দিনের নাম। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে সিলেট নগরের উপশহরের সি ব্লকে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির অফিসে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। অফিসের ভেতরে কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন ইমন উদ্দিন। একপর্যায়ে দুর্ব্যবহার করে তাদের অফিস থেকে বের করে দিতেও দেখা যায় তাকে।

সেখানে অপেক্ষমাণ স্বামী-স্ত্রী এসেছেন সুনামগঞ্জ থেকে। তারা বলেন, ‘ফেসবুকে ভিডিওতে দেখেছি তারা খুব সহজেই পুরো পরিবারসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসা পাইয়ে দেয়। তাই আমরা এসেছি।’ সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ইমন উদ্দিন। নিজেকে ছাত্রদল নেতা পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিতে থাকেন। এরপর একের পর এক রাজনৈতিক নেতাকে ফোন করে সংবাদ প্রচার বন্ধের চেষ্টা করেন।

একপর্যায়ে ফ্রেশ হওয়ার কথা বলে ওয়াশরুমে যাওয়ার অজুহাতে সেখান থেকে পালিয়ে যান তিনি। পরে নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি ‘ম্যানেজ’ করার প্রস্তাব দিয়ে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি মিডিয়া মো. মনজুরুল আলম বলেন প্রবাসে নেওয়ার নামে কোনো ভুয়া এজেন্সি খুলে যদি কেউ প্রতারণা করে তাহলে আমার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করি। কেউ যদি প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন, আমাদের কাছে অভিযোগ দিলে আমরা সরাসরি তার অভিযোগ আমলে নিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
প্রবাস ডেস্ক

প্রবাস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৫-১৮ ১৫:৩৭:৩৮