সিলেটে নারীদের দিয়ে পাতা ফাঁদে বার বার পা দেন পুরুষরা। বিশেষ করে যুবকরা। হয় সংবাদ প্রকাশ। পুলিশ বলে সতর্ক হতে। তবু ফেরে না হুঁশ।
তেমনই এক যুবক জিল্লুর রহমান (২৭)। তিনি সোমবার (১ জুন) ‘মধুফাঁদে’ (হানিট্র্যাপ) পা দিয়ে অপহরণ ও মারধরের শিকার হয়েছেন। পরে এসএমপির এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। এসময় পুলিশ সেই চক্রের ২ নারী ও ৩ পুরুষকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- কুনিপাড়ার এমরান খানের স্ত্রী মীম আক্তার নাহিদা (২২), একই পাড়ার নাসির মিয়ার ছেলে মিল্লাত (২০), মিল্লাতের মা শিল্পি বেগম (৪০), শাহপরাণ থানাধীন কল্পগ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে এমরান খান (২৪) ও একই থানার সুরমা গেইট এলাকার বিলাল মিয়ার ছেলে স্বপন আহমেদ (২৩)।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানান- জিল্লুর রহমানের সঙ্গে কিছুদিন আগে অভিযুক্ত মীম আক্তার নাহিদা নামে নারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলতে থাকে।
এরই সুবাধে মীম আক্তার সোমবার জিল্লুর রহমানকে দেখা করার জন্য ডেকে নেয়। সে ডাকে সাড়া দিয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে জিল্লুর এয়ারপোর্ট থানাধীন ইলেকট্রিক সাপ্লাই রোডস্থ বড়বাজার গলির মুখে পৌঁছালে মীম আক্তার ও তার সঙ্গে থাকা মিল্লাত, এমরান খান ও স্বপন আহমেদ তাকে ঝাপটে ধরে মারধর করে এবং জোরপূর্বক অপহরণ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে কুনিপাড়া এলাকায় নিয়ে যায়।
সেখানে নিয়ে গিয়ে জিল্লুরকে একটি বসতঘরে আটক করে রাখা হয়। সেখানে অবস্থান করা শিল্পি বেগমসহ আরও কয়েকজন তাকে বেধড়ক মারধর করে পকেটে থাকা ৮ হাজার নিয়ে নেয়। এছাড়া অভিযুক্তরা জিল্লুরের কাছে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
এসময় তাদের মারধরে জিল্লুর চিৎকার করলে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে জরুরি সেবা নাম্বার ৯৯৯-এ পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে এয়ারপোর্ট থানার একদল পুলিশ কুনিপাড়ায় গিয়ে জিল্লুর রহমানকে উদ্ধার এবং অভিযুক্তদের আটক করে।
পরে তাদের বিরুদ্ধে জিল্লুর রহমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে সে মামলায় এ ৫ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হলে বিজ্ঞ বিচারকের নির্দেশে জেলহাজতে প্রেরণ করে পুলিশ।
জানা গেছে, সিলেটে ভয়ংকর এই চক্র যে ফাঁদ পাতে তার নাম ‘হানি ট্র্যাপ’ বা ‘মধুফাঁদ’। এমন ‘মধুফাঁদ’র একাধিক চক্র গড়ে উঠেছে সিলেটে। এদের মধ্যথেকে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে চক্রকে নির্মূল করা যায়নি।
এসব চক্রের অপকর্ম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজেরে আসে গত এপ্রিলে। দুই ভুক্তভোগীর পরিবারের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালালে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
গত ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট মহানগরের মেন্দিবাগ পয়েন্ট থেকে রিফাত ও মাহফুজ নামের দুজনকে হানি ট্র্যাপ চক্রের সদস্য মো. আব্দুল জলিল প্রতারণার মাধ্যমে অপর সদস্য মো. জায়েদ আহমদ চালিত সিএনজি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যান। এরপর রাত সাড়ে ১০টায় শাহজালাল উপশহরের যতরপুর এলাকার নবপুষ্প-১১৩ নম্বর বাসার পঞ্চম তলায় নিয়ে গিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সহায়তায় এই দুজনকে জিম্মি করে। ওই বাসায় পূর্ব থেকেই অবস্থানরত জেসমিন আক্তার এবং চক্রের মূলহোতা তানজিলা আক্তার ওরফে রাবেয়া বেগম তানহাসহ চার-পাঁচজন।
এসময় মিলে রিফাত ও মাহফুজকে ধারালো অস্ত্র প্রদর্শন করে ইলেকট্রিক শক প্রদানের মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন চালায়। তাদেরকে উলঙ্গ করে অশ্লীল ভিডিও ধারণ করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে মোট ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
পরবর্তীতে ভিকটিম মাহমুদুল হাসান রিফাত আত্মীয়-স্বজনের নিকট থেকে ৯০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আনিয়ে দেন। তখন ওই দুই যুবকের পরিবারের লোকজন সন্দেহের প্রেক্ষিতে কোতোয়ালি মডেল থানাপুলিশকে অবহিত করলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই বাসা থেকে ২ নারী ও ২ পুরুষকে আটক করে।
এ ঘটনায় মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশ পরে এ চক্রের আরেকজনকে গ্রেফতার করে। এদিকে, ওই মামলার আরেক আসামিকে গত ৫ মে গ্রেফতার করে র্যাব-৯ এর একটি টিম।
এই চক্রগুলোর মূল কাজই হলো নারীদের মাধ্যমে পুরুষদের জন্য ফাঁদ পাতা, মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তারা গড়ে তুলেছে নিজস্ব আস্তানা। এসব ঘটনা সামনে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মনজুরুল আলম বলেন- বিভিন্ন সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি, সিলেটে ‘হানি ট্র্যাপ’র একাধিক চক্র রয়েছে। পুলিশ এসব চক্রের শেকড়সহ উপড়ে ফেলতে চায়। এ লক্ষ্যে তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে একটি বিষয়- এই ক্ষেত্রে ভুক্তভোগিরা পুলিশের দ্বারস্থ হতে লজ্জা পান। কিন্তু যারাই আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছেন তাদেরকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো।
কেউ এমন ঘটনার শিকার হলে পুলিশকে অবগত করার আহ্বান জানিয়েছেন এডিসি মোহাম্মদ মনজুরুল আলম।
স্টাফ রিপোর্টার



















