স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে যখন দেশ বিভোর, তখন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চিত্র যেন উল্টো পথের পথিক। গত শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাত ২টা থেকে টানা চার দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় স্থবির হয়ে আছে পুরো ইউনিয়ন।
প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগেও এখানে ডানা মেলেছে মধ্যযুগীয় অন্ধকার; মানুষের একমাত্র ভরসা এখন হারিকেন আর কুপির বাতি। ৯৬ ঘণ্টা পার হলেও বিদ্যুৎ না ফেরায় জনদুর্ভোগ এখন চরমে।
বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে মানবিক সংকটে পড়েছে চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা। তীব্র গরম আর কুপির আবছা আলোয় রাতের বেলা পড়াশোনা করতে হচ্ছে তাদের। এমনকি দিনের বেলাও গুমোট গরমে প্রস্তুতি নিতে হিমশিম খাচ্ছে তারা।
এসএসসি পরীক্ষার্থী তুষ্টি পাল ও তাওহীদ হাসান তানজিম আক্ষেপ করে বলেন, কয়েক দিন ধরে কারেন্ট না থাকায় আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। কুপির বাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করে আমাদের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ কুপির ধোঁয়া ও স্বল্প আলোয় পড়লে চোখে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, তার ওপর গরমে টেবিলে বসাই দায়। পরীক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন বিদ্যুৎহীনতা আমাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন জরুরি সেবা নিতে আসা শত শত মানুষ। কমলগঞ্জ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা পিংকি পাল বলেন, ডিজিটাল সেন্টারের কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ইন্টারনেটসহ যাবতীয় সরঞ্জাম বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কারেন্ট না থাকায় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ বা জরুরি অনলাইন আবেদনের মতো কোনো সেবাই আমরা দিতে পারছি না। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ফিরে যাচ্ছেন। ডিজিটাল যুগের সেবাকর্মী হয়েও কুপির বাতির নিচে বসে থাকা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।
টানা বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পুরো এলাকা যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। চার্জের অভাবে মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এলাকাবাসী। এনটিভির কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি মো. আহাদ মিয়া বলেন, ৪ দিন ধরে কারেন্ট না থাকায় আমরা মোবাইল ফোন চার্জ দিতে পারছি না, যার ফলে সময়মতো সংবাদ পাঠানো বা পেশাগত দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বৈদ্যুতিক পাম্প চালাতে না পারায় এলাকায় তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) এবিএম মিজানুর রহমান জানান, গত কয়েক দিনের ঝড়-বৃষ্টির কারণে বিদ্যুতের লাইনের ওপর গাছ উপড়ে পড়ে এবং বেশ কিছু জায়গায় খুঁটি ও ইনসুলেটর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আমাদের কর্মীরা গত রোববার থেকেই মাঠে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। মূল সঞ্চালন লাইনে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দেওয়ায় মেরামত করতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে আমরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং আশা করছি খুব দ্রুতই বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। টানা চার দিন অতিবাহিত হলেও বিদ্যুৎ না ফেরায় স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর দাবি, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে যেন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয় এবং পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ডিজিটাল যুগের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অন্ধকার থেকে মুক্তি চায় ভুক্তভোগী কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নবাসী।
সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক




















