কাউয়াদীঘির মনু প্রকল্প

মৌলভীবাজারে পাম্প চলছে সিন্ডিকেটের ইশারায়, হাজার হেক্টর জমির ফসলডুবি

  • প্রকাশের সময় : ২৭/০৪/২০২৬ ০৩:৫৭:৩৪ PM

মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরে আবাদ বোরো ফসলের জমি তলিয়েছে চৈত্রের বর্ষণে। সেখানে কোমর সমান পানিতে নেমে কষ্টের ফসল কুড়ানোর চেষ্টায় এক কৃষক।

Share
18

মৌলভীবাজার জেলার কাউয়াদীঘি হাওর অধ্যুষিত এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের ফসল আবাদ ও তা রক্ষায় মনু নদের তীরে বাস্তবায়ন করা হয় ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প। তবে সিন্ডিকেটের হাতে পড়ে সেই ফসল রক্ষার প্রকল্প সম্প্রতি পরিণত হয়েছে কৃষকের সর্বনাশের হাতিয়ারে।

মনু প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউস এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। যার মাধ্যমে হাওরের পানির প্রবাহ ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা হয় চাষাবাদের জন্য। অভিযোগ রয়েছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন অসাধু কর্মচারী ও ঘের ইজারাদারদের একাংশ সিন্ডিকেট গড়ে পাম্প চালাচ্ছে। যার কারণে চলতি মৌসুমে হাওরে জলাবদ্ধতায় সহস্রাধিক হেক্টর জমির ফসলহানি ঘটেছে।

সম্প্রতি মনু প্রকল্পের রাজনগরস্থ কাশিমপুর পাম্প হাউস কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে হাওরের পানি সেচ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। এতে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হচ্ছে তাদের। স্থানীয়রা বলছেন, ঘের ইজারাদারদের সুবিধা দিতে গিয়ে হাওরের সহস্রাধিক হেক্টর জমির ফসল নষ্টের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য অনুসন্ধানকালে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কাউয়াদীঘি হাওরের অবস্থান। হাওরটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ শস্য ভান্ডার। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ও বর্ষাকালে জলাবদ্ধতায় প্রায়ই ফসলহানি হতো এই হাওরে। প্রান্তিক কৃষিজীবীদের এই সংকট দূর করার লক্ষ্যে আশির দশকে বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

১৯৮২ সালে বাংলাদেশ-কুয়েতের যৌথ উদ্যোগে শত কোটি টাকা ব্যয়ে মনু নদের তীরে বাস্তবায়ন করা হয় মনু ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প। যার কাশিমপুর অংশে স্থাপন করা হয় পাম্প হাউজ। এর মাধ্যমে কৃষকের প্রয়োজন মতো শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। স্থাপিত ব্যারাজের মাধ্যমে মনু নদে সংরক্ষিত পানি নালার মাধ্যমে সেচের কাজে ব্যবহারের জন্য পানি সরবরাহ হয়।

অন্যদিকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা থেকে ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত কাশিমপুর পাম্প হাউসের আটি পাম্প ব্যবহার করে আবাদি জমির অংশ থেকে কুশিয়ারায় ফেলে দেওয়া হয় বাড়তি পানি। তবে চলতি মৌসুমে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

কৃষকদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিল ইজারাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে পানি সেচ দিচ্ছে না। এতে হাওরের ধান ডুবুডুবু অবস্থায় রয়েছে। সঠিকভাবে পানি সেচ দেওয়া হলে প্রতিদিন সেখানে পানি কমত। রক্ষা পেত কষ্টের ফসল। এবার প্রয়োজন মতো পাম্প নিয়ন্ত্রণ না করায় কাউয়াদীঘি হাওরে এক ইঞ্চি পানিও কমেনি।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, মনু প্রকল্পে হাওর ও হাওরাঞ্চলের বাইরে মিলিয়ে ১০ হাজার ২৪০ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে কাউয়াদীঘি হাওরে রয়েছে ছয় হাজার হেক্টরের বেশি বোরো জমি। জেলার হাওরাঞ্চলের প্রায় ৫৫ ভাগ জমির ফসল কাটা হয়ে গেছে। তবে কাউয়াদীঘি হাওরের হিসাব আলাদাভাবে তাদের কাছে সংরক্ষণ করা নেই।

স্থানীয় বোরোচাষিদের কয়েকজন জানান, হাওরের তিন ভাগের এক ভাগ ধানও কাটা হয়নি। জমিতে কোথাও কোমরসমান, কোথাও আবার বুকসমান পানি জমে আছে। সেখানে হারভেস্টার ব্যবহারের সুযোগ নেই। এই অবস্থায় শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে গেলে দিতে হবে চড়া মজুরি। এর মধ্যে জমির বড় অংশের ধানই নষ্ট হবে।

কাউয়াদীঘি হাওরপারের কান্দিগাঁও গ্রামের রনি আহমদ মিজু জানান, ১৭ কেয়ার জমির মধ্যে মাত্র দেড় কেয়ার জমির ধান কাটতে পেরেছেন। মাছের ঘেরে পানি ধরে রেখে ইজারাদারদের সুবিধা দিতে গিয়ে কৃষকের সর্বনাশ করেছেন পাম্প পরিচালকরা। হাউসের আটটি পাম্পের মধ্যে চারটি নিয়মিত সচল রাখা হয়। সব চালু থাকলে জলাবদ্ধতা থাকত না।

একই গ্রামের আরেক কৃষক শেখ আহবাবুর রহমান জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালনাধীন কাশিমপুর পাম্প হাউস কর্তৃপক্ষ কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছে। বিভিন্ন অজুহাতে হাওরের পানি সেচ না দিয়ে ঘের ইজারাদারদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত তারা। ইজারাদাররা হাওরে পোনা মাছ ছেড়েছে, সেগুলো দ্রুত বড় হওয়ার জন্য নানা অজুহাত দেখিয়ে সেচ বন্ধ রাখা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, হাওরে এখন পানির লেভেল ৪ থাকার কথা। তবে রয়েছে ৪ দশমিক ৬ পর্যায়ে। প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে, চারদিকের পানি খাল-নালা হয়ে হাওরে জমা হচ্ছে। ফলে সেচ দিয়েও পানি কমানো যাচ্ছে না। আটটি পাম্প চালানোর মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৪-২৭ ১৫:৫৭:৩৪