সিলেট প্রেসক্লাব প্রবর্তিত ‘সাংবাদিক এটিএম তুরাব স্মৃতি পদক’-এ ভূষিত হয়েছেন সিলেটের প্রবীণ সাংবাদিক, দৈনিক নয়া দিগন্ত-এর সিলেট ব্যুরো প্রধান আবদুল কাদের তাপাদার। শনিবার (১৯ জুলাই) বিকেলে সিলেট প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির তাঁর হাতে ক্রেস্ট, পদক ও সম্মাননার অর্থ তুলে দেন।
পুলিশের গুলিতে নিহত তরুণ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এ আলোচনা সভা ও পদক প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সিলেট প্রেসক্লাব।
সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসাইন চৌধুরী এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের স্বীকৃতি
সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় অবদান রেখে আসছেন আবদুল কাদের তাপাদার। অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরে তিনি পাঠকমহলে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন। একসময় তিনি দৈনিক জালালাবাদ-এর নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। বিভাগজুড়ে কর্মরত তৃণমূল সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক ও আন্তরিকতা। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণে জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে একাধিক মামলার আসামিও হতে হয়েছে।
পদকপ্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করে আবদুল কাদের তাপাদার বলেন, সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তুরাব হত্যাকাণ্ড একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো একজন সাহসী সাংবাদিককে আমরা হারিয়েছি।
‘তুরাব আমাদের প্রেরণার উৎস’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে হুমায়ুন কবির বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ এটিএম তুরাব আমাদের সবার প্রেরণার উৎস। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের নির্ভয়ে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তুরাব হত্যার বিচারে দ্রুত অগ্রগতির দাবি
সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, তুরাব হত্যার বিচার বিলম্বিত হওয়া উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিশোধ চাই না, আমরা ন্যায়বিচার চাই। এই হত্যার বিচার দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তদন্ত যেন দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো না হয়ে যায়।
মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মামলার ধীরগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসাইন চৌধুরী বলেন, কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন বলেন, রাজনৈতিক কারণে আর কোনো মানুষের রক্ত ঝরুক—এটি কেউ চায় না।
এছাড়া বক্তব্য দেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী ও ইকরামুল কবির, সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ হান্নান, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদর, সাবেক কোষাধ্যক্ষ কবীর আহমদ সোহেল, সহ-সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ এবং ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন। অনুষ্ঠান শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ক্লাব সদস্য কবির আহমদ।
সভাপতির বক্তব্যে মুকতাবিস উন নূর বলেন, “তুরাব হত্যা মামলার আসামিদের রক্ষায় শুরু থেকেই একটি পক্ষ সক্রিয় ছিল। আমরা চাই তুরাবের পরিবার ন্যায়বিচার পাক।
ডেটলাইন: ১৯ জুলাই ২০২৪—যেভাবে নিহত হন সাংবাদিক এটিএম তুরাব
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর সিলেট নগরের বন্দরবাজার এলাকায় বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর একটি মিছিল চলাকালে সংঘর্ষের পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। ওই সময় পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন।
তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, তার শরীরে অসংখ্য গুলির আঘাত ছিল এবং লিভার ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনার পর সিলেটসহ সারাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং তুরাব হত্যার বিচার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়।
সত্য ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথে জীবন উৎসর্গকারী সাংবাদিক এটিএম তুরাবের স্মৃতিকে ধরে রাখতে সিলেট প্রেসক্লাবের এই পদক প্রবর্তনকে সাংবাদিক সমাজ তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছে।
স্টাফ রিপোর্টার



















