উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই চিড়েচ্যাপ্টা দশা সাধারণ মানুষের। নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ধাপে খরচ শুধু বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অস্থিরতা-অনিশ্চয়তার প্রভাবে দেশে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। রান্নায় ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) পেছনে খরচও আগের চেয়ে অনেকখানি বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে তা এক এক করে কৃষি, পণ্য সংরক্ষণ, শিল্প, পরিবহন, বিপণন এবং সেবা খাতে খরচ বাড়িয়ে দেয়, যা ঘুরেফিরে ভোক্তার কাঁধে এসে পড়ে। বিশেষ করে মধ্য ও নিম্নবিত্তদের ওপর চাপ অনেক হারে বেড়ে যায়। তাদের টিকে থাকাকে আরও কঠিন করে তোলে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব বলছে, গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। আগের মার্চ মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। মার্চের চেয়ে এপ্রিলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দুটোই বেড়েছে। এপ্রিলে যা যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩৯ ও ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, সব ধরনের পণ্যের পেছনে খরচের চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় এ চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাজার বিশ্লেষক ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাবেক সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, জীবনযাত্রার খরচের চাপে মানুষ ভালো নেই। এর মধ্যে যারা নির্দিষ্ট আয়ের (ফিক্সড ইনকাম) বা পেনশনের টাকায় চলেন, তারা খুব সংকটে রয়েছেন। পাশাপাশি খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠী ও দরিদ্রদের ওপরও মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি। মধ্যবিত্তরাও এখন এ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের টিকে থাকতে ঋণ বাড়ছে। পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেকে ঘর ভাড়াও নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে তারা সংসার খরচে কাটছাঁট করছেন। এমন সময় বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। বর্তমান সরকার বলেছিল বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। কিন্তু সেটা তো হলো না।
সাবেক এ বাণিজ্য সচিব আরও বলেন, জ্বালানি তেলের সঙ্গে রান্নার গ্যাসের দামও বেড়েছে। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ল। স্বাভাবিকভাবেই বাজার ও অর্থনীতিতে এর ‘রিপল ইফেক্ট’ (ছড়িয়ে পড়া) পড়বে। এটা উৎপাদন খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দেবে, কৃষিপণ্য সংরক্ষণে ও প্রক্রিয়াজাতে ব্যয় বাড়তে পারে, শিল্প খাতসহ পরিবহন খাতেও প্রভাব পড়বে। সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার খরচের চাপ বাড়বে। সেইসঙ্গে ঋণের বোঝাও বাড়বে। মূল্যস্ফীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়িয়েছে। গত বুধবার রাজধানীর রমনায় কমিশন কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেন। যদিও গতকাল বৃহস্পতিবার তা আংশিক সংশোধন করে আবাসিক খাতে দুই শ্রেণির গ্রাহকের জন্য আগের দাম নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বস্তি দিতে এ সংশোধন করা হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, আবাসিকে প্রান্তিক গ্রাহকদের শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী লাইফলাইন শ্রেণি এবং প্রথম ধাপের ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর জন্য আগের দাম পুনর্বহাল করতে বিতরণ সংস্থাগুলো আবেদন বিবেচনায় নিয়ে এ দুই শ্রেণির জন্য আগের দাম বহাল রাখা হয়েছে।
এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পেছনে নীতিগত ব্যর্থতা দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম। কালবেলাকে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধ না করে সাধারণ জনগণের ওপর দামের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ খাতে অন্যায়ভাবে যে ঘাটতি বেড়েছে, ব্যয় বেড়েছে, মুনাফা বেড়েছে, এখান থেকে টাকা আত্মসাৎ হয়েছে; সেসব জায়গা থেকে ‘প্রটেক্ট’ না করে, কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। মানে, সহজ পথে হেঁটেছে সরকার। আগে এ খাতের অনিয়মগুলো দূর করতে হবে।
ক্যাবের এই জ্বালানি উপদেষ্টা আরও বলেন, এর প্রভাব খাদ্য থেকে শুরু করে কৃষি, উৎপাদন, পণ্যমূল্যসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পড়বে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে এবং মানুষের ভোগ ব্যয় কমবে, পণ্য ও সেবা ক্রয় কমবে। সার্বিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রা সংকুচিত হবে। সরকার মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার যে কথা বলছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কৌশলগত পরিকল্পনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সেখানে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
গত ৩১ মে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এদিকে গত মার্চ থেকে চলতি জুন সময়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ওঠানামা করে সর্বশেষ ১ হাজার ৮৮৫ টাকায় ঠেকেছে। মার্চে যা ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অর্থাৎ, সিলিন্ডারের পেছনে ভোক্তার ব্যয় ৫৪৪ টাকা বা ৪০ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
বাজার, যাতায়াত, বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে বাড়তি ব্যয়ের মাঝে রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে বেসরকারি চাকরিজীবী মো. জসিব উদ্দিনের। রাজধানীর কালশী এলাকার বাসিন্দা এ ব্যক্তি কালবেলাকে বলেন, ‘প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট বেতনের টাকায় সংসার চালাতে হয়, তা দিয়ে বাসা ভাড়া, যাতায়াত ও বাজারের খরচ সামাল দিতেই হিমশিম খেতে হয়। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছে। সিলিন্ডার গ্যাসের পেছনে খরচ অত্যধিক বেড়েছে। আবার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হয়। এখন আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ায় আরও কত খরচ জানি বেড়ে যাবে। কিন্তু বেতন তো সেভাবে বাড়ে না। ওদিকে ঋণ পরিশোধেরও চাপ রয়েছে। কোন খরচ বাদ দিয়ে কোনটা সামাল দেব—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটে।’
টিকে থাকতে সংসারের অনেক খরচ বাদ দিয়েছেন কদমতলী এলাকার অটোরিকশা চালক মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মাছ-মাংস খাওয়া প্রায় বাদ দিছি। পরনের কাপড় কেনা কমাইছি। বিয়া-সাদির অনুষ্ঠানেও যাই না। আর কত কাটছা




















