পৃথিবীতে মিঠাপানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। এর একটি সিলেটের রাতারগুল; দেশের একমাত্র মিঠা পানির জলাবন (সোয়াম্প ফরেস্ট)। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকের চাপে ক্রমেই বিপন্ন হয়ে উঠছে রাতারগুল। অতিরিক্ত পর্যটকের ভিড়, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের অবাধ চলাচল এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরে এখানে পর্যটকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন স্থানীয়দের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে বনটির প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। রাতারগুল-সংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দা ও নৌকার মাঝি আব্দুল হালিম জানালেন, ‘আগে বনের ভেতরে ঢুকলেই নানা রকম পাখি আর বানর দেখা যেত। এখন পর্যটকের ভিড় আর শব্দে সেগুলো অনেক কমে গেছে।’ তার উদ্বেগ, ‘আমরা আয় করছি ঠিকই, কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একসময় বনই নষ্ট হয়ে যাবে।’
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা খাদিজা বেগমের কথা, ‘পর্যটকরা অনেক সময় প্লাস্টিক, বোতল, খাবারের প্যাকেট ফেলে যায়। এগুলো পরিষ্কার করার নেই কোনো সরকারি ব্যবস্থা। এতে নোংরা হচ্ছে পানি।’ রাতারগুল জলাবন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে। নদী ও হাওরবেষ্টিত ৫০৪ দশমিক ৫০ একর আয়তনের এই জলাবনে রয়েছে পানিসহিষ্ণু প্রায় ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদ। আছে পাখি, সাপ, কাঠবিড়ালিসহ অসংখ্য প্রাণী।
১৯৭৩ সালে রাতারগুল জলাবনকে সংরক্ষিত ঘোষণা করে বন বিভাগ। ‘রাতারগুল একটি সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত হলেও পর্যটকের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় নিয়ন্ত্রণে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আমরা পর্যটক নিয়ন্ত্রণে কিছু নির্দেশনা দিয়েছি। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল ও নজরদারি না থাকায় সবসময় তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ইঞ্জিনচালিত নৌযান নিয়ন্ত্রণেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে’— বলছিলেন সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানালেন, ‘রাতারগুলে পর্যটন ব্যবস্থাপনা আরও সুসংগঠিত করতে আমরা কাজ করছি। নির্দিষ্ট প্রবেশ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান সতর্ক করলেন, ‘যদি এখনই পর্যটক প্রবেশে সীমা নির্ধারণ, ইকো-ফ্রেন্ডলি নৌযান চালু এবং কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে রাতারগুল তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাতে পারে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের কার্যকরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজার পরামর্শ, ‘রাতারগুলকে বাঁচাতে হলে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে টেকসই ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু রাজস্ব আয়ের চিন্তা করলে চলবে না, পরিবেশ রক্ষাই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য।’
পর্যটকরাও স্বীকার করছেন, অনেক ক্ষেত্রেই অসচেতনতার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ‘অনেকেই নিয়ম মানেন না। প্লাস্টিক ফেলে যান, জোরে গান বাজান’— বলছিলেন ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সায়মা ইসলাম। তার মতে, এসব বন্ধ না করলে জলাবনের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে। পর্যটকদের আরও সচেতন হতে হবে।
সিলেট বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানালেন, ‘পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো নির্দিষ্ট কোটা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে ছুটির দিনে ও মৌসুমভিত্তিক সময়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি আছে। স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন-সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং বন বিভাগের মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন। এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে যাবে।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিনহাজ উদ্দিন বললেন, ‘পর্যটন আমাদের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করেছে, কিন্তু তা যেন পরিবেশ ধ্বংসের কারণ না হয়। নিয়মকানুন আরও কঠোর করা প্রয়োজন।’



















